“আমি আপনার এখানে এখন বসে আছি। আমার কাছে মেসেজ আছে, তারা রাস্তায় বসে আছে দুইটা অস্ত্র নিয়ে… তারা বসে আছে। আমি যাওয়ার সময় গুলি করে দিবে… আমি অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ে রিপোর্ট করি… সশস্ত্র যে গ্রুপগুলি আছে, তাদের নিয়ে আমি নিউজ করে থাকি, মাদক থেকে শুরু করে সব। … সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই আসামীকে যদি ধরা না হয়, হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, নতুবা তাদের থেকে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। সেই সিদ্ধান্তটা আপনাকে নিতে হবে…”
মৃত্যুর ঠিক দশ মাস আগে নেত্রকোণার তৎকালীন পুলিশ সুপারের সামনে দাঁড়িয়ে এক জনাকীর্ণ সভায় আর্তনাদ করে কথাগুলো বলেছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কিন্তু না, রাষ্ট্র তাঁর এই জীবনভিক্ষার আকুতি শোনেনি। প্রশাসন তাকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। ফলে গত ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোণার দুর্গাপুরের উত্তরারাইল বাজারের এক চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় মোটরবাইকে আসা দুই সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী নির্মমভাবে গুলি করে তাঁর বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। ছয়-ছয়টি বুলেট তাঁর শরীর ভেদ করে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই নিভে যায় একটি সত্যসন্ধানী কণ্ঠস্বর।
আলিফ ফকিরের এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার ওপর চেপে বসা এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। নেত্রকোণার এই সাংবাদিক স্থানীয় পর্যায়ে মাদক চোরাচালান, বালু মহালের নৈরাজ্য ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে সাহসের সাথে কাজ করতেন। এর আগে ২০২৩ সালের ১০ নভেম্বরও তাঁর ওপর মারাত্মক হামলা হয়েছিল, যেখানে তাঁকে কুপিয়ে মৃতপ্রায় করে ফেলা হয়। সেই সময় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে আজকে হয়তো তাঁর এই পরিণতি হতো না। কিন্তু বিচারহীনতার যে চিরস্থায়ী সংস্কৃতি এ দেশে গড়ে উঠেছে, তারই চরম মূল্য দিতে হলো আলিফ ফকিরকে।
যদি আমরা গত দুই বছরের বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সার্বিক চিত্রটি খতিয়ান আকারে বিশ্লেষণ করি, তবে যে কোনো সচেতন নাগরিকের গা শিউরে উঠবে। এই দুই বছরে কেবলই সাংবাদিক নির্যাতন, নির্বিচার গ্রেপ্তার, মব ভায়োলেন্স, ডিজিটাল ও সাইবার আইনের খড়্গ, গুমের হুমকি এবং কর্পোরেট বা রাজনৈতিক কারণে গণহারে চাকরিচ্যুতির এক কালো ইতিহাস।
হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান দিয়ে যদি শুরু করি, তবে দেখা যাবে মাঠপর্যায়ে সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে একের পর এক সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে। গত বছরের ৭ আগস্ট গাজীপুরে শ্রীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয় স্থানীয় চাঁদাবাজির খবর প্রকাশের জেরে। তার আগে ২০২৫ সালের ২৫ জুন ঢাকার কাছেই নবীনগরে সাংবাদিক খন্দকার শাহ আলমকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এক সাবেক কয়েদি, যার অপরাধের বিরুদ্ধে শাহ আলম কলম ধরেছিলেন। এছাড়াও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন হাসান মেহেদী (ঢাকা টাইমস), মো. শাকিল হোসেন (ভোরের আওয়াজ), আবু তাহের মো. তুরাব (দৈনিক নয়া দিগন্ত), তাহির জামান প্রিয় এবং প্রদীপ কুমার ভৌমিকসহ একাধিক গণমাধ্যমকর্মী। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (IFJ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের জন্য বাংলাদেশকে অন্যতম বিপজ্জনক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
হত্যার পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও মব ভায়োলেন্সের মাত্রা গত ২৪ মাসে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে প্রায় পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মব বা উন্মত্ত জনতার হামলা, রাজনৈতিক ক্যাডারদের মারধর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব’ সংস্কৃতির আড়ালে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। কোনো একটি সংবাদের জেরে দলবেঁধে পত্রিকা অফিস বা টেলিভিশন ব্যুরো অফিসে হামলা চালানো, ভাঙচুর করা এবং সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক মুচলেকা নেওয়ার মতো মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রথম সারির একাধিক গণমাধ্যমে।
মফস্বল সাংবাদিকতার অবস্থা আরও করুণ। সেখানে ইউপি চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে চোরাকারবারি দলের চুনোপুঁটি সদস্যরাও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করতে দ্বিধা করে না। বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর একটি মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র এক মাসেই ৪৩ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। গ্রেপ্তার ও আইনি হয়রানি এ দেশের সাংবাদিকতার আরেক বড় প্রতিবন্ধকতা। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা দায়েরের এক আত্মঘাতী উৎসব শুরু হয়েছে। কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে দেশের শত শত সিনিয়র ও জুনিয়র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা এবং উস্কানি দেওয়ার মামলা করা হয়েছে। অনেক পেশাদার সাংবাদিককে আজ কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাতে হচ্ছে, যাদের অপরাধ কেবল তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছিলেন; কিংবা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ। সাইবার নিরাপত্তা আইনের (পূর্বতন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অপব্যবহার করে মফস্বলের সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও কারান্তরীণ করার ঘটনা এই সময়ে বন্ধ হয়নি। আইনের এই অপপ্রয়োগ সাংবাদিকদের মধ্যে একটি অদৃশ্য ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার শামিল।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘গুমের হুমকি’ ও মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। মাঠপর্যায়ের অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া, তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল ও চরিত্রহনন করে পেশা ছেড়ে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সাংবাদিক আজ নিজেদের ফেসবুক বা ব্যক্তিগত ওয়ালে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে ভয় পান। আলিফ ফকিরের মতো অনেকেই প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।
গণমাধ্যমের এই বাহ্যিক সংকটের সমান্তরালে ভেতরে ভেতরে চলছে চরম অর্থনৈতিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তা। গত ২৪ মাসে দেশের গণমাধ্যম শিল্পে এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ ‘চাকরিচ্যুতি’ ও ছাঁটাইয়ের মহোৎসব চলেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত সংবাদকর্মীকে চাকরি থেকে অবহেলায় বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। অনেক বড় বড় মিডিয়া হাউস মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রেখেছে, যার ফলে বহু সাংবাদিক আজ সপরিবারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অর্থনৈতিক দাসত্ব ও চাকরি হারানোর ভয় সাংবাদিকদের মেরুদণ্ডকে সোজা হতে দিচ্ছে না। একজন সাংবাদিক যখন নিজের ভাতের নিশ্চয়তা পান না, তখন তাঁর পক্ষে সমাজের রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে গিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আমরা যারা টেবিল বা ডেস্কে বসে সম্পাদকীয় লিখি, আমাদের বুঝতে হবে সাংবাদিকতা আজ শুধু একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা নয়, এটি এখন জীবন বাজি রাখার খেলা। লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের সেই ভিডিও ফুটেজটি যখন দেখি, যেখানে তিনি আকুতি জানাচ্ছেন, “হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, নতুবা তাদের থেকে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে” তখন লজ্জা ও ক্ষোভে মাথা হেঁট হয়ে যায়। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে, একজন সাংবাদিককে এমন এক চরম ও নিষ্ঠুর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল কীভাবে? কেন তাঁকে তাঁর সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার জন্য বুলেটের আঘাতে মরতে হবে?
গণমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি যদি একের পর এক আঘাত, হত্যা, মামলা ও মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হয়, তবে রাষ্ট্র নামক ইমারতটি ধসে পড়তে বাধ্য। সাংবাদিক আলিফ ফকিরের হত্যার পর দুর্গাপুরসহ দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজ ফুঁসে উঠেছে, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে আলিফ ফকির, আসাদুজ্জামান তুহিন এবং শাহ আলমের মতো সকল সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীদের ও তাঁদের পেছনের গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
পাশাপাশি, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল কাল্পনিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপর মব ভায়োলেন্সের সংস্কৃতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে এবং সাংবাদিকদের চাকরির ও বেতনের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
আলিফ ফকির চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো আমাদের বিবেকের দরজায় প্রতিনিয়ত করাঘাত করে যাবে। আমরা কি একটি স্বাধীন, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই, নাকি পেশিশক্তি ও বুলেটের কাছে কলমের পরাজয় দেখতে চাই? সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আর কত লাশের পর গণমাধ্যম নিরাপদে, নির্ভয়ে কাজ করতে পারবে? অবসান হোক অন্ধকারের; আলোর মুখ দেখুক বাংলাদেশের মুক্ত সাংবাদিকতা।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ প্রবাহ

