গেল বছরের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা ও স্টেশন থেকে লুট হওয়া প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র এখনও উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ বিপুল অস্ত্র ভাণ্ডার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে না ফেরা নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) জানিয়েছে, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো ইতিমধ্যে কয়েক দফা হাত বদল হয়েছে। এর ফলে সেগুলো উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। সোমবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক নাজমুল্লাহেল ওয়াদুদ বলেন, “অস্ত্র উদ্ধার একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ হলেও আমরা নিরলস অভিযান চালাচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, বর্তমান তৎপরতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে।”
অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ সদস্যরা থানা–স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতার মধ্যে অস্ত্র লুট হয়ে যায়। এক বছরেও অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসকে দুর্বল করে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এত সময় পেরিয়েও কেন রাষ্ট্র এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।
র্যাবের পর্যবেক্ষণ, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে কিছু গোষ্ঠী পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। লুট হওয়া অস্ত্র যদি সংগঠিত অপরাধী বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তবে নির্বাচনী সহিংসতা ও সহিংস রাজনীতির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পরিচিত মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিমকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হলেও, তারা জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই পুনরাবৃত্তি বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি এই চক্র ভাঙাও এখন সময়ের দাবি।
অস্ত্র উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। হাতবদলের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম ও তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা প্রদর্শন করতে হবে, যাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে এবং তারা সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়।
বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা কাটিয়ে পুনরাবৃত্ত অপরাধ ঠেকানোও অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত প্রয়োজন, কারণ নির্বাচনকে সহিংসতাহীন রাখার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মৌলিক দুর্বলতা। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই অস্ত্রগুলো নাগরিক জীবনে সহিংসতা বাড়াবে, নির্বাচনের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার একটি জটিল কাজ। তবে র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযান এবং প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার হলে এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে । এখন দরকার ধৈর্য, সমন্বিত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো অব্যাহত থাকলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হবে এবং দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আরও দৃঢ় হবে।
আকীল আকতাব
বিশ্লেষক ও লেখক।


