সোমবার | আগস্ট ৩১ | ২০২৬

মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলো। এই জোটকে অনেকেই আপাতদৃষ্টিতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য বা ইসলামি ন্যাটো বলার চেষ্টা করছেন। ইসলামি জোট করলে অবশ্যই সেখানে ইরান, মিশর ও অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশ থাকতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও উত্তর আফ্রিকায় মিশর প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এই দুই দেশ বাদ দিয়ে ইসলামি জোট হলো বর ছাড়া বরযাত্রার মতো ঘটনা। এই চুক্তির গভীরে প্রবেশ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি আসলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এই জোটের নাম মক্কা জোট হলেও এর নকশা তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটনে এবং এর প্রতিটি পদক্ষেপ পরিচালিত হচ্ছে মার্কিন স্বার্থকে কেন্দ্র করেই। প্রথমেই যে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে তা হলো এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ইরানকে ঠেকানো।

মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একমাত্র ইরানই এমন একটি শক্তি যারা প্রকাশ্যে মার্কিন আধিপত্য এবং ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। ইরান দীর্ঘ সময় ধরেই মার্কিন তাবেদারি মানছে না এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে। এই কারণে ইরানকে দুর্বল করা বা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা বহু বছর ধরেই আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য। সৌদি আরব একা ইরানের সাথে সামরিক বা কৌশলগত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না কারণ সৌদি সেনাবাহিনী যতই দামি অস্ত্রই কিনুক না কেন তাদের যুদ্ধ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মনোবল নেই। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের কাছে তাদের অসহায়ত্ব প্রমাণিত হয়েছে। তাই আমেরিকা এখন একটি নতুন ফর্মুলা নিয়ে এসেছে। সৌদি আরবের টাকায় তুরস্কের প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সৈন্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে ফেলা হবে। এই জোটের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে একটি সামরিক বলয় তৈরি করা হচ্ছে যা প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয় হিসেবেই কাজ করবে। এই জোটে সৌদি আরবের ভূমিকা বুঝতে হলে সৌদি রাষ্ট্রের চরিত্র বুঝতে হবে। সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি তাবেদার রাষ্ট্র। সৌদি রাজপরিবারের অস্তিত্ব টিকে আছে মার্কিন সমর্থনের ওপর। তাদের তেল বিক্রি হয় ডলারে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, তাদের রাজপ্রাসাদ পাহারা দেয় মার্কিন নিরাপত্তা পরামর্শকরা। সৌদি আরবের ইতিহাসে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেই যা আমেরিকার অনুমতি ছাড়া নেওয়া হয়েছে। যখনই সৌদি আরব সামান্য স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই তেল উৎপাদন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে তাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তারা কার আশ্রয়ে আছে। তাই মক্কা জোটে সৌদি আরবের যোগ দেওয়া মানে আসলে আমেরিকার অনুমতি নিয়ে আমেরিকার আরেকটি প্রকল্পে যোগ দেওয়া। সৌদি আরব মূলত আমেরিকার শক্তিতেই চলে এবং আমেরিকার শক্তি দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই জোটের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তুরস্ক। তুরস্ককে অনেকেই মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখাতে চান কিন্তু গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। ন্যাটো মানেই আমেরিকা। ন্যাটোর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে আমেরিকার ভেটো থাকে। তুরস্কের সামরিক বাহিনী ন্যাটো কাঠামোর ভেতরেই পরিচালিত হয়। তুরস্কের বিখ্যাত বায়রাকতার ড্রোন থেকে শুরু করে তাদের এফ-১৬ বিমান সবকিছুর যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি ন্যাটো নির্ভর। তাই তুরস্ক শক্তিশালী হলে তা সরাসরি ন্যাটোকে শক্তিশালী করে এবং ন্যাটো শক্তিশালী হওয়া মানেই আমেরিকার লাভ। আমেরিকা এখন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠাতে চায় না কারণ আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। তাই তারা চায় তাদের মিত্রদের দিয়ে কাজ করাতে। তুরস্ককে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কাজ করানো অনেক সহজ এবং কম ব্যয়বহুল। মক্কা জোটের মাধ্যমে তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বৈধতা দেওয়া হলো এবং একই সাথে তুরস্ককে ন্যাটোর জাল থেকে বেরিয়ে রাশিয়া বা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে আটকানো হলো। এটি আমেরিকার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক জয়।

এই জোটের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো চীনকে ঠেকানো। গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চীন সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি করিয়েছে, সৌদি আরবের সাথে ইউয়ানে তেল বাণিজ্যের আলোচনা শুরু করেছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বন্দর ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে। এটি আমেরিকার জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট। ডলারের আধিপত্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আমেরিকার বিশ্বশক্তি হিসেবে টিকে থাকা কঠিন। তাই মক্কা জোটের মাধ্যমে সৌদি আরবকে আবার সামরিকভাবে আমেরিকার বলয়ে বন্দী করা হলো। যখন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা নির্ভর করবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ওপর যারা উভয়েই ঘুরেফিরে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল তখন সৌদি আরব চাইলেও সহজে চীনের দিকে যেতে পারবে না। সামরিক নির্ভরশীলতা সবসময় রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করে। এই জোট চীনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা আমেরিকার মিত্রদের হাতেই থাকবে। একইভাবে এই জোট রাশিয়াকেও চাপে রাখবে। রাশিয়া সিরিয়া যুদ্ধে জয়ী হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান শক্তিশালী করেছিল। তুরস্ক সিরিয়ায় ও কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার সরাসরি প্রতিপক্ষ। পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাবকে ভারসাম্যহীন করতে পারে। আর সৌদি আরব তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। এই তিনটি দেশকে একত্রিত করলে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ককেশাস এবং মধ্য এশিয়া পর্যন্ত একটি সম্মিলিত চাপের মুখে পড়বে। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে আমেরিকা রাশিয়াকে দুর্বল করতে চায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার মিত্র সিরিয়া ও ইরানকে চাপে রাখা আমেরিকার ইউক্রেন কৌশলেরই অংশ। মক্কা জোট সেই চাপ তৈরির একটি নতুন হাতিয়ার।

সবশেষে পাকিস্তানের ভূমিকা সবচেয়ে স্পষ্ট। পাকিস্তানকে বলা হয় আমেরিকার ভাড়াটে সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী মার্কিন ডলার ও অস্ত্রে পুষ্ট। আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদ, পরবর্তীতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সবখানেই পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে প্রক্সি যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও তার ব্যবহারের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আছে কারণ দেশটির অর্থনীতি আইএমএফ এবং মার্কিন সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানকে মক্কা জোটে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো সৌদি রাজপরিবারের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার সবচেয়ে পরীক্ষিত ভাড়াটে বাহিনীকে নিয়োগ দেওয়া। পাকিস্তানি সেনারা আগেও সৌদি আরবে মোতায়েন ছিল। এখন সেটি একটি চুক্তির মাধ্যমে বৈধতা পেল। ফলে আমেরিকা নিজে একজন সৈন্যও না পাঠিয়ে তার ভাড়াটে বাহিনী দিয়ে সৌদি তেলক্ষেত্র পাহারা দেবে। এই পুরো বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে মক্কা জোট মুসলিম বিশ্বের কোনো স্বাধীন জোট নয়। এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ। আগে আমেরিকা সরাসরি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য দখল করতো এখন তারা স্থানীয় মিত্রদের দিয়ে সেই দখলদারি বজায় রাখছে। এই জোটের ফলে ইরান ঘেরাও হবে, চীন ও রাশিয়া চাপে থাকবে, ইসরায়েল নিরাপদ থাকবে এবং আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা চলতে থাকবে। কারণ এই জোটের তিনটি দেশই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আমেরিকা ও ন্যাটো থেকে কেনে। তাই দিনশেষে মক্কা থেকে যে ধ্বনি উঠছে তা আল্লাহু আকবর নয় বরং আমেরিকার জয়ধ্বনি। এই জোট মুসলমানদের কোনো উপকারে আসবে না বরং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থানকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে। এই জোটের অর্থনৈতিক দিকটিও আমেরিকার লাভের সাথে জড়িত। সৌদি আরবের বিশাল উদ্বৃত্ত অর্থ তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ হবে এবং পাকিস্তানের সামরিকতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখবে কিন্তু সেই অর্থের উৎস ডলার এবং সেই ডলারের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে। ফলে এই ত্রিমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতাও শেষ পর্যন্ত ডলার সিস্টেমকে শক্তিশালী করবে। তাছাড়া এই জোট মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ছোট দেশ যেমন বাংলাদেশের মতো দেশকেও এই জোটে টানার চেষ্টা করছে বলে খবর বেরিয়েছে। বাংলাদেশকে এই জোটে নিলে ভারতের চারপাশে আরেকটি মার্কিন বলয় তৈরি হবে যা ভারতকে চাপে রাখতে আমেরিকার ইন্দো প্যাসিফিক কৌশলের অংশ। অর্থাৎ মক্কা জোট শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয় দক্ষিণ এশিয়াতেও আমেরিকার ঘুঁটি সাজানোর কাজ করছে। ইতিহাস সাক্ষী মধ্যপ্রাচ্যে যত জোট হয়েছে তার সবগুলোই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করেছে। বাগদাদ প্যাক্ট থেকে সেন্টো কোনোটাই এর ব্যতিক্রম ছিল না। মক্কা জোটও তার ব্যতিক্রম হবে না। মুসলিম বিশ্বের আবেগকে ব্যবহার করে পবিত্র মক্কার নাম ব্যবহার করে যে জোট তৈরি হলো তার ফসল ঘরে তুলবে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব। সাধারণ মুসলমানদের মুক্তি এই জোটে নেই বরং নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খল আরও শক্ত হলো। আমেরিকা এখন আরবের মাটিতে নিজের বুট না রেখেও আরবের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে তার তাবেদার সৌদি রাজপরিবার, তার ন্যাটো মিত্র তুরস্ক এবং তার ভাড়াটে সৈনিক পাকিস্তানের মাধ্যমে। এটাই হলো মক্কা জোটের আসল রূপ এবং এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হলো। এই জোটকে ধর্মীয় মোড়কে উপস্থাপন করা হলেও এর ভেতরে কোনো ইসলামী আদর্শ নেই, আছে কেবল ভূরাজনৈতিক হিসাব। ফিলিস্তিনের গাজায় যখন প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে তখন এই জোটের কোনো বিকার নেই। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের রা-টিও শোনা যাবে না কখনোই।

লেখক: সাংবাদিক

Share.
Exit mobile version