মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬
মো. আবদুর রহমান

সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক, “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫” এর বিষয়ভিত্তিক মান বণ্টন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আমরা দেখতে পাই, মোট ৪০০ মার্কের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ মার্ক করে মোট ৩০০ মার্ক। এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এই দুই বিষয় মিলে ৫০ করে মোট ১০০ মার্ক।

কিন্তু আমরা জানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী সব বিষয় বৃত্তি পরীক্ষায় থাকলেও, অজানা কারণে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি আমাদের ব্যথিত করেছে। বৃত্তি পরীক্ষায় না থাকার ফলে, শিক্ষকরা ধর্ম শিক্ষা বিষয়টি আগের মতো গুরুত্ব দেবেন না। বাকি ৫টি বিষয় বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়াবেন। এমনকি শিক্ষার্থীরা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

যেহেতু বাকি বিষয়গুলো বৃত্তি পরীক্ষার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত, তাই তারা ঐ গুলোই পড়বে। এটা আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। যেমনটা আমরা এসএসসি পরীক্ষার সময় করেছি। গণিত কিংবা ইংরেজি যতটুকু গুরুত্ব দিতাম, অপশনাল (অতিরিক্ত বিষয়) আমরা তেমনটা গুরুত্ব দিতাম না।

ফলে এ দেশের ৮০% লোক কৃষির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল হলেও, আমরা কৃষি শিক্ষা অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে পড়ার কারণে, ঠিকঠাক জানি না কোন মাসে কোন ফসল বুনতে হয়। সারাজীবন পৌরনীতি অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে পড়ার কারণে; নাগরিকের দায়িত্ব-কর্তব্য অনায়াসে ভুলে যাই। ভুলে যাই রাষ্ট্রের আসলে কাজ কী? রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ কী?

ধর্ম ও নৈতিকতা বিষয়টাতো আরো জটিল। মুসলিমের ঘরে জন্ম নিলেই অটোমেটিক মুসলিম হওয়া যায় না। এবং ধর্মের সব জ্ঞান নিজে নিজে অর্জিত হয় না। এমনটা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই। তাহলে ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বিষয়টি বাদ দেওয়ার কারণ কী!!

শিশুরা কাঁচা মাটির মতো। এবং ওদের মস্তিষ্ক খুবই তীক্ষ্ণ। এই বয়সে যা শিখবে, তা সারাজীবন মনে থাকবে। তাই বৃত্তি পরীক্ষায় ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়টি থাকলে, এই উপলক্ষে শিশুরা বইটির খুঁটিনাটি ভালো করে শিখতো। তাতে তাদের ধর্মীয় ভিত্তি এবং নৈতিকতা মজবুত হতো।

ধর্ম ও নৈতিকতা বিহীন মানুষ সমাজের ও দেশের শত্রু। একটি শিশু যদি বড় ডিগ্রির সাথে সাথে মনুষ্যত্ব অর্জন না করে, তবে ঐ ডিগ্রি কিংবা বড় পদ, দেশের ও সমাজের কোনো কাজে আসবে না।

আমার মতে, একটি শিশু বৃত্তি পেলো কিনা, তার থেকে বড় বিষয়, সে ভালো মানুষ হলো কিনা? অধিদপ্তরের ভাবনায় হয়তো– ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বইটি; ধর্ম অনুযায়ী আলাদা, এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে প্রশ্ন তৈরিতে একটু জটিলতা ও খরচ বেশি হবে হয়তো। কিন্তু সামান্য খরচ বাঁচাতে গিয়ে আমরা ধর্ম ও নৈতিকতা বিষয়টি হেলা করতে পারি না।

কেননা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে যদি একজন সন্ত্রাসী কিংবা মাফিয়া, ঘুষখোর কিংবা চাঁদাবাজের জন্ম হয়, তবে সেটা দেশের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হবে। তাই দেশকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের একটু কষ্ট মেনে নিতেই হবে।

তাই, আমার মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপবৃত্তি ৫০০ নাম্বারে করা হোক, এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে ১০০ মার্ক রাখা হোক। তাতে আগের সব কিছু বহাল রেখে, শুধু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নাম্বার যুক্ত করলেই হয়।

আমরা আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে। কেননা, প্রতিটি ধর্মই মানুষকে কল্যাণের কথা বলে। সব ধর্মের মূলনীতি প্রায় একই। আমরা নিজেদের সুবিধার্থে ধর্মকে নিজের মতো করে পালন করি।

অকারণে জীব হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, মিথ্যা বলা– সব ধর্মেই নিষিদ্ধ। তেমনি সদা সত্য বলা, মা-বাবার সেবা ও গুরুজনকে সম্মান করা, দেশপ্রেম– সকল ধর্মে উৎসাহিত করা হয়েছে।

পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম হলো ধর্ম ও নৈতিকতার চর্চা। প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধর্ম সঠিকভাবে পালন করলে, পৃথিবীতে আর কোনো অশান্তি তৈরি হবে না। কিন্তু ধর্ম সঠিকভাবে মানতে হলে, ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। নচেৎ হিতে বিপরীত হয়। ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।

সুতরাং ধর্মের সঠিক জ্ঞানের ভিত্তি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু করা এবং বিষয়টির গুরুত্ব সহকারে অধ্যয়নের স্বার্থে বৃত্তি পরীক্ষায় “ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা” বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

Share.
Exit mobile version