ভারতের আসাম রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উচ্ছেদ ও বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযান নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। সীমান্তবর্তী জেলায় শত শত মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু বর্তমানে নীল ত্রিপলের নিচে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন। সরকারি জমিতে ‘অবৈধ’ বসবাসের অভিযোগে তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে রাজ্য সরকার অন্তত ৩,৪০০ পরিবারের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেছেন, “অবৈধ অভিবাসনে হিন্দুরা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে।” তবে এই বক্তব্যের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর কোনও মন্তব্য করেনি।
২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং ২০২১ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত এই উচ্ছেদ অভিযান রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সরকারের হিসেবে, ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে উচ্ছেদের মুখে পড়েছেন, যাদের অধিকাংশই বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে মনোভাব আরও চরমে উঠেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী আচরণের ফলে ভারতীয় মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। আসামের উচ্ছেদ অভিযানেও ধর্মীয় মেরুকরণ স্পষ্ট।
কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, সরকার নির্বাচনী সুবিধা নিতে মুসলিমদের টার্গেট করছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ক্ষমতায় ফিরে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও দায়ী কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, “অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের নামে ভারতের বিজেপি সরকার প্রকৃতপক্ষে মুসলিমবিরোধী বৈষম্যমূলক নীতিকে কার্যকর করছে।”
বাংলাদেশে পাঠানো এবং ‘বিদেশি’ তকমা
আসাম সরকার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকশ’ মুসলমানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যদিও অনেকেই ভারতের নাগরিকত্ব দাবি করে আদালতে আপিল করে আবার ফিরেছেন। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনাল প্রায় ৩০,০০০ মানুষকে “বিদেশি” ঘোষণা করেছে। অধিকাংশই বহু বছর ধরে বসবাস করে আসছেন, জমিজমা ও পরিবার রয়েছে, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০১৬ সালে ভারত দাবি করে, দেশটিতে ২ কোটিরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মে মাসে জানায়, বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য তাদের হাতে ২,৩৬৯ জনের তালিকা রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি।
জাতীয়তাবাদ বনাম বাস্তবতা
আসামের মুখ্যমন্ত্রী প্রায়শই সীমান্তে মুসলিম অনুপ্রবেশ ঠেকানোর খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছেন। বিশ্লেষক প্রবীণ দন্তি বলেন, “আসামের ঐতিহাসিক জাতিগত জাতীয়তাবাদ এখন বিজেপির ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। এই জোটবদ্ধ জাতীয়তাবাদের প্রধান লক্ষ্য এখন বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা।”
গোয়ালপাড়ার শিবিরে বসবাসরত ৫৩ বছর বয়সী আরান আলী বললেন, “আমাদের ‘বিদেশি’ বলা হচ্ছে, অথচ আমি এই রাজ্যেই জন্মেছি। বারবার আমাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।”
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আসামের ২৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বরাবর অভিবাসন, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতির টানাপড়েন এখন কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগে চলমান এই অভিযান শুধু ধর্মীয় মেরুকরণই নয়, মানবিক সংকটকেও গভীরতর করে তুলছে।
সংবাদ সূত্র: রয়টার্স


