একসময় সন্ধ্যা নামলে বাংলার অসংখ্য উঠোনে দোতারার সুর ভেসে আসত। সেই সুরে থাকত নদীর ঢেউ, কাশবনের হাওয়া, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস, আবার প্রেমে পড়া কোনো তরুণীর নিঃশব্দ অপেক্ষাও। দোতারা তখন শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না; ছিল বাংলার মানুষের জীবনকথার ভাষা। সেই ভাষার সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্পীদের একজন ছিলেন কানাইলাল শীল। আজ তাঁর গান আছে, তাঁর সুর আছে, তাঁর শিল্পজীবনের কিংবদন্তি আছে; অথচ তাঁর জন্মভিটা নীরবে সময়ের কাছে হার মানছে।
আমরা প্রায়ই বলি, লোকসংগীত আমাদের শিকড়। কিন্তু সেই শিকড়ের রক্ষকদের আমরা কতটা মনে রাখি? যে মানুষটি সারা জীবন গ্রামবাংলার সুরকে শহরের মঞ্চে, গ্রামোফোনের রেকর্ডে, কলকাতার বেতারে, পরে ঢাকা বেতারের তরঙ্গে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতি আজও একটি ছোট্ট গ্রামে অযত্নে পড়ে আছে। যেন তাঁর দোতারার তারগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছে।
১৮৯৫ সালে ফরিদপুরের লস্করপুরে জন্ম নেওয়া কানাইলাল শীলের সংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল বেহালা দিয়ে। পরে দোতারাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সঙ্গী। কিংবদন্তি দোতারা বাদক তরবন সরকারের শিষ্যত্ব গ্রহণের পর তিনি বুঝেছিলেন, এই বাদ্যযন্ত্রের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার মানুষের হাসি-কান্নার সবচেয়ে অকৃত্রিম উচ্চারণ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কবিগান, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, কীর্তন, গাজীর গান কিংবা যাত্রাপালার আসরে তাঁর দোতারার আলাদা পরিচয় তৈরি হয়।
ভাগ্য তাঁর জীবনে একটি বড় দরজা খুলে দেয় পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের হাত ধরে। জসীমউদ্দীন শুধু তাঁর প্রতিভা চিনেছিলেন তা-ই নয়, তাঁকে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে আব্বাসউদ্দীন আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং সেই সময়ের আরও বহু গুণী শিল্পীর সঙ্গে কানাইলাল শীলের সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশভাগের পর ঢাকা বেতার দুই বাংলার শ্রোতারা বছরের পর বছর তাঁর দোতারার সুর শুনেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর বাজনা এতটাই মাটির কাছাকাছি ছিল যে জনপ্রিয়তার ঝলকানি কখনোই তাঁকে তাঁর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
কানাইলাল শীলকে শুধু একজন দোতারা বাদক বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার এবং লোকসংগীতের এক নিবেদিত সাধক। তাঁর লেখা ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’, ‘আমায় ঘরছাড়া করিলি রে, সুখ বসন্ত সুখের কালে’-এর মতো গান আজও শিল্পীরা গেয়ে চলেছেন। তাঁর সুরে এমন এক সহজ সৌন্দর্য ছিল, যা কোনো কৃত্রিম অলংকারের ওপর নির্ভর করত না। গ্রামীণ জীবনের ভাষা, মানুষের সহজ অনুভূতি এবং লোকঐতিহ্যের স্বাদ তাঁর গানকে আজও সতেজ করে রেখেছে। শচীন দেব বর্মন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমানের মতো শিল্পীরা তাঁর গান গেয়েছেন এটি কেবল একজন শিল্পীর সাফল্য নয়, তাঁর সৃষ্টির গ্রহণযোগ্যতারও বড় প্রমাণ।
বাংলাদেশ তাঁকে একুশে পদকে সম্মানিত করেছে। এই স্বীকৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি পদক কোনো শিল্পীর উত্তরাধিকারকে দীর্ঘস্থায়ী করে না। শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর গান, তাঁর সৃষ্টিকর্ম, তাঁর স্মৃতি এবং তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে। সেই জায়গায় আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে।
আজও যদি কেউ কানাইলাল শীলের জন্মভিটায় যান, সেখানে তাঁর জীবনকে জানার মতো তেমন কিছুই পাবেন না। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই একজন শিল্পীর ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, হাতে লেখা গানের খাতা, বসার ঘর কিংবা একটি গাছ পর্যন্ত যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়। কারণ তারা জানে, এগুলো একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক নীতিতেও লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সেই আলোকে কানাইলাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে একটি লোকসংগীত স্মৃতিকেন্দ্র, গবেষণাগার বা ছোট্ট জাদুঘরে রূপান্তর করা কঠিন কোনো কাজ নয়। তাঁর গানের স্বরলিপি, পুরোনো রেকর্ড, দোতারা, আলোকচিত্র এবং বেতারে সংরক্ষিত পরিবেশনাগুলো ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। এগুলো একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।
তবে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। আমাদের বেতার, টেলিভিশন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভাবা উচিত, নতুন প্রজন্ম কানাইলাল শীলকে কতটা চেনে। তাঁর গান কি যথেষ্ট গাওয়া হচ্ছে? তাঁর সুর কি নিয়মিত শেখানো হচ্ছে? তাঁর জীবন কি গবেষণার বিষয় হয়ে উঠছে? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না-সূচক হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা এখনো তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি।
লোকসংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি মানুষকে তার শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়। কানাইলাল শীল সেই ফেরার পথের একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাঁর দোতারার তারে যে বাংলার কথা ধ্বনিত হয়েছিল, তা আজও আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। সেই পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাঁর গান আরও বেশি গাওয়া দরকার, তাঁর জীবন আরও বেশি জানা দরকার, আর তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটাকে সংরক্ষণ করা দরকার শুধু একজন শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নয়, নিজেদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে অমলিন রাখার জন্য।
