মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

সংবাদপত্র শুধু খবরের কাগজ নয়, এটি একটি জাতির আয়না। কিন্তু যখন সেই আয়নায় বিকৃত প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে, তখন মানুষের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে সঠিক সংবাদ প্রচারে নানা প্রতিবন্ধকতা আছে। কর্পোরেট স্বার্থ, ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক চাপ কিংবা দলীয় আনুগত্য ইত্যাদি কারণে সংবাদ প্রায়শই হয়ে ওঠে পক্ষপাতদুষ্ট। এর ফলে পাঠক যে নিরপেক্ষ সত্য পাওয়ার কথা, তা অনেক সময় হারিয়ে যায় শব্দের আড়ালে।

সাংবাদিকতা একসময় ছিল সাহসিকতা ও সততার প্রতীক। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সাংবাদিক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক দলে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়। পাঠকও বুঝে যায়, এই খবরের পেছনে হয়তো কোনো উদ্দেশ্য আছে। ধীরে ধীরে এই অবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ সংবাদপত্র পড়া কমিয়ে দিয়ে বিকল্প মাধ্যম খুঁজে নিচ্ছে। বিকল্পের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল। কিন্তু এভাবে কী সত্যিকারের তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত হয়? নাকি গুজব ও অপপ্রচার আরও বাড়ে? এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে সিনেমা হলের উদাহরণ।

একসময় দেশের সিনেমা হলগুলো ছিল বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা ছিল একধরনের উৎসব। কিন্তু ধীরে ধীরে নকল সিনেমা, নিম্নমানের গল্প এবং অশ্লীলতার ভিড়ে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। পরিবারগুলো হলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, অল্প সিনেমা তৈরি হবে ঠিকই কিন্তু হলে তেমন মানুষ যাবে না, ঠিক যেন সিনেমার হোম ডেলিভারি। হোম ডেলিভারির এই প্রথা চালু হয়ে গেলে সিনেমা হলগুলো একসময় যাত্রাপালার মতো বিলুপ্তির পথে হাঁটতে পারে। বাস্তবে ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে অনেক সিনেমা হল গুঁড়িয়ে ফেলে সেখানে মার্কেট, শপিংমল বা অন্য ব্যবসা গড়ে তোলা হয়েছে। বিনোদনের আসনচ্যুত হয়ে বাণিজ্যের আধিপত্য বিস্তার করেছে। এক সময়ের প্রাণবন্ত শিল্প আজ কেবল স্মৃতির পাতায় বেঁচে আছে।

এই বাস্তবতা সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি সংবাদ পরিবেশন দলবাজির কারণে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে, তাহলে পাঠক সংবাদপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আর যখন পাঠক হারিয়ে যাবে, তখন সংবাদপত্র শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখেই পড়বে না অনেক সাংবাদিক চাকরি হারাবেন, অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাবে। আজ যেমন সিনেমা শিল্পের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে রাস্তায় ঘুরছেন, তেমনি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা দিতে পারে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কত সাংবাদিক পলাতক, কতজন কারাগারে, আবার কত মানুষ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতি শুধু একটি পেশার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কারণ সংবাদ শুধু খবর নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি।

তাই সময় এসেছে দলবাজি, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকতাকে তার আসল রূপে ফিরিয়ে আনার। বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদই একটি সংবাদপত্রের জীবনরেখা। তা না হলে, আজকের সিনেমা হলের মতোই একদিন সংবাদপত্রও হয়ে যাবে অতীতের গল্প, আর তখন ফিরে আসার সুযোগ আর থাকবে না। বিশ্বাস ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু হারানো বিশ্বাস ফিরে পেতে পুরো প্রজন্মও যথেষ্ট না হতে পারে।

 

খসরু খান

লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

Share.
Exit mobile version