২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লব’ বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছিল। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমরা দেখছি, এ ঘটনার সাংস্কৃতিক প্রভাব সমাজে নানা বিভ্রান্তি, বিকৃতি ও সংকীর্ণতা ডেকে আনছে। বিপ্লবের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যেভাবে প্রোপাগান্ডামূলক কনটেন্ট, থিম সং, নাটক ও মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে তা সত্যিকারের ইতিহাসকে ছায়াচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, তরুণদের মনে এখন দেশের স্বাধীনতা মানেই যেন ‘জুলাই বিপ্লব’। এই প্রবণতা আমাদের ইতিহাস-সচেতনতা ও জাতীয় চেতনার জন্য একটি বিপজ্জনক সংকেত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণজাগরণ, জনযুদ্ধ, বহুমাত্রিক আত্মত্যাগ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অর্জিত স্বাধীনতা। এর বিপরীতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত রাজনৈতিক নাটকীয়তা মূলত তাৎক্ষণিক এক ধাক্কা যা সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নগুলোর অবসান ঘটায়নি বরং নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অথচ প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে এই ঘটনাকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে যা একটি প্রজন্মকে ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আবার এটাও সত্য যে বিগত সময়ে যতটুকু প্রয়োজন ততটুক না দেখে ৭১ নিয়ে, স্বাধীনতার ঘোষক, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো এই ‘বিপ্লব’ আমাদের সংস্কৃতিতে কী ধরনের ক্ষতি করেছে? প্রথমত, স্বাধীনতা যুদ্ধের যে আত্মত্যাগ, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় গভীরভাবে চর্চিত হয়েছে, সেই ঐতিহাসিক বয়ান এখন দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে। ‘জুলাই বিপ্লব’কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া কনটেন্ট, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও, গান, ব্যঙ্গচিত্র এবং নাটক অনেকক্ষেত্রেই কল্পনাপ্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
দ্বিতীয়ত, এই বিপ্লবের নামে গড়ে উঠেছে একধরনের ‘উৎসব সংস্কৃতি’। বর্ষপূর্তি ঘিরে পোস্টার, ব্যানার, টেলিভিশন প্রোগ্রাম, এমনকি স্কুল কলেজে ‘বিপ্লব দিবস’ পালনের মত আয়োজন, যেখানে সত্যিকারের ইতিহাসচর্চার চেয়ে ‘গ্লোরিফিকেশন’ ও আবেগই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে ‘বিপ্লবী হিরো’ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা উপাধি দেয়া হচ্ছে যা সংগ্রামের ক্ষেত্রে সঠিক। কিন্তু অতিরঞ্জিত তকমা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে TikTok, YouTube Shorts, এবং Facebook Reels। এটি মূলত ‘মিডিয়া-নির্ভর জাতীয়তাবাদ’ যার ভিত্তি অনেকটাই জাল, বিকৃত ও সময়োপযোগী নয়।
তৃতীয়ত, সংস্কৃতি হয়ে উঠছে রাজনৈতিক হাতিয়ার। যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক বা প্রযোজক ‘জুলাই বিপ্লব’ নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাদের অনেকেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করছেন বা রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। এতে করে স্বাধীন ও বিকল্প মত প্রকাশের ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
চতুর্থত, এই বিপ্লব ঘিরে যে আবেগ তৈরি হচ্ছে, তা অনেকটা ‘শর্টকাট ইতিহাস’-এর মতো। তরুণদের অনেকে এখন মনে করে, দেশে আসল পরিবর্তন এসেছে এই ২০২৪ সালের ঘটনার মাধ্যমেই। তাদের মধ্যে অনেকেই জানে না ১৯৭১ সালে কী হয়েছিল, কীভাবে লাখো মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি আদায় করতে হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক অনবধানতা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের জন্য ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।
পঞ্চমত, ‘বিপ্লব উৎসব’ একটি শ্রেণিভিত্তিক সংস্কৃতিও তৈরি করছে। শহুরে উচ্চবিত্ত তরুণদের জন্য এটি একটি ‘ট্রেন্ডি’ বিষয়, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এই বিপ্লবের কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। ফলে একটি সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে যেখানে একদল মানুষ বিপ্লব নিয়ে গান-নাটক করছে, আরেকদল মানুষ জীবনের মৌলিক অধিকার নিয়েই সংগ্রাম করছে।
অতএব, এই মুহূর্তে জরুরি হলো ‘জুলাই বিপ্লব’-কে রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনা হিসেবে বিশ্লেষণ করা, কিন্তু এটিকে ‘স্বাধীনতার প্রতিস্থাপন’ হিসেবে দেখা সাংস্কৃতিক আত্মঘাত। ইতিহাস কখনোই তাৎক্ষণিক আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং ইতিহাসের মূল শক্তি হলো সময়ের বিচারে তার সত্যতা ও ত্যাগের গভীরতা।
জুলাই বিপ্লবকে সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণ করার আগে আমাদের ভাবতে হবে এই বিপ্লব কীভাবে আমাদের ঐতিহাসিক চেতনায় প্রভাব ফেলছে? নতুন প্রজন্ম কী শিখছে? তারা কী শেখ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ জানে? ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার তাৎপর্য বোঝে? ১৬ ডিসেম্বরের তাৎপর্য বোঝে? নাকি তাদের কাছে ‘৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্ট’-ই এখন ‘মুক্তির দিন’?
সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এই সংকটে আমাদের দায়িত্ব ইতিহাসকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করা। আমরা যদি সত্যিকারের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থাকি, তবে আমাদের উচিত হবে জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক মূল্যায়নকে যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু স্থান দেয়া এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের অবিস্মরণীয় গৌরবকে সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।
লেখক: সংস্কৃতি কর্মী
সাধারণ সম্পাদক
সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার


