জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য এক মহামঞ্চ। এটি কেবল কূটনৈতিক উপস্থিতি নয়; বরং একটি দেশের অবস্থান, নীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্র। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেছে, তবে এই সফর নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে বহরের আকার, খরচ এবং আসন সীমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অধিবেশনের মূল কক্ষে মোট আসন সংখ্যা ১,৮০০, যেখানে প্রতিটি দেশের জন্য বরাদ্দ ছয়টি আসন। এর মধ্যে তিনটি আসন মূল প্রতিনিধিদের জন্য, যারা অধিবেশনে ভোট দিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। বাকি তিনটি আসন বিকল্প প্রতিনিধিদের জন্য, যারা প্রয়োজনের সময় সরকার প্রধান/রাষ্ট্রপ্রধানদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কক্ষে বসে অধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম। এই ছয়টি আসনেই দেশ, সদস্য এবং নির্দিষ্ট প্রতিনিধির নাম তালিকাভুক্ত থাকে, যাতে আনুষ্ঠানিক রেকর্ড স্পষ্ট থাকে এবং বিদেশি প্রতিনিধি বা অতিথিদের সাথে পরিচিতি নিশ্চিত হয়।
যদিও আইনগতভাবে আসনের সংখ্যা সীমিত, বাস্তবে বাংলাদেশ প্রায় ১০০ জনের বেশি সফরসঙ্গী পাঠিয়েছে, যেখানে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, নিরাপত্তা, প্রোটোকল ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা ছিলেন। মন্ত্রীরা অংশ নেন উচ্চ-স্তরের বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনায়, উপদেষ্টা দেশের নীতি ও কৌশলগত বিষয় সমন্বয় করেন। বাকিরা প্রোটোকল, নিরাপত্তা ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দেন। তবে প্রশ্ন ওঠে—শতাধিক সফরসঙ্গী পাঠানো প্রয়োজন ছিল কি?
অধিবেশনে এটি স্পষ্ট যে, আসনের সংখ্যা সীমিত হলেও বড় বহর পাঠানো হয়। এর আগের অনেক অধিবেশনে, ২০২৫ সালের তুলনায়, সরকার প্রধানরা আরও বড় বহর নিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। এখানে সংস্কার প্রয়োজন। এই ধরনের যোগদানের বিষয়, জনবল নিয়ন্ত্রণ, বহরের আকার ও দায়িত্ব নির্ধারণে যথাযথ সংস্কার করা উচিত। যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো, জনগণের অর্থ কিছুটা হলেও সাশ্রয় হতো। যাকে ইচ্ছে তাকে অকারণে বহরে নিয়ে যাওয়ার মনোভাবও কমে আসত।
খরচের বিষয়টি অবশ্য নজরকাড়া। বিমান ভাড়া ইকোনমি ক্লাসে ঢাকা–নিউইয়র্ক যাওয়া-আসায় ২ লাখ টাকা, আর বিজনেস ক্লাসে ৬–৭ লাখ টাকা। খবর অনুযায়ী সফরসঙ্গীদের বেশিরভাগই বিজনেস ক্লাস ব্যবহার করেছেন। একজনের কেবল যাওয়া-আসার খরচ গড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬.৫ লাখ টাকা। হোটেল, খাবার, যাতায়াত ও নিরাপত্তা খরচ মিলিয়ে একজনের সফর ব্যয় হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০–১২ লাখ টাকা। ১০০ জন সফর করলে মোট খরচ ১০–১২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, আসন সীমিত হলেও বহরের আকার বাড়লে খরচ বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়।
অন্য দেশের উদাহরণ দেখলে আরও স্পষ্ট হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত সাধারণত সীমিত বহর পাঠায়, যেখানে প্রত্যেকের দায়িত্ব স্পষ্ট। জাপান এবং সিঙ্গাপুরও একইভাবে নির্বাচিত সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠায়, যাতে খরচ ও কার্যকারিতা ভারসাম্য বজায় থাকে। আবার চীন বা সৌদি আরব বড় বহর পাঠালেও তারা সেই বহরকে কার্যকরভাবে কাজে লাগায় এবং পরে জনগণকে স্পষ্ট হিসাব দেয়। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই স্বচ্ছতার অভাবই বিতর্ক তৈরি করেছে।
এখানে আরও একটি বাস্তব বিষয় হলো—সফরসঙ্গীদের দায়িত্ব ও অবদান স্পষ্টভাবে জানানো। অনেক সময় কর্মকর্তারা কেবল প্রোটোকল বা নিরাপত্তা কাজে থাকলেও বহরের আকার অনেক বড় হয়। ফলে জনগণ জানতে চায়—মন্ত্রীরা কোন উচ্চ-স্তরের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, উপদেষ্টা কী নীতি সমন্বয় করেছেন, এবং অন্যান্য কর্মকর্তা কোথায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। এই তথ্য প্রকাশ করা গেলে কেবল খরচের হিসাব স্পষ্ট হবে না, বরং বিদেশি সফরও দেশের জন্য আরও ফলপ্রসূ হবে।
অধিবেশনে যোগদানের সময় সংস্কারের প্রয়োজন স্পষ্ট। শুধু আসন সংখ্যা নয়, সফরসঙ্গীর সংখ্যা, বহরের দায়িত্ব, কক্ষে বসার সুযোগ এবং আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে নাম অন্তর্ভুক্তির নিয়ম—সবকিছুর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের সংস্কার জনগণের টাকায় অতিরিক্ত খরচ কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি যাকে ইচ্ছে অকারণে বহরে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
জাতিসংঘ সফর তাই কেবল কূটনৈতিক উপস্থিতি নয়; এটি দেশের মর্যাদা, নীতি উপস্থাপন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক পরীক্ষা। তবে খরচ, আসনের সীমা এবং বহরের আকারের মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকাটাই সফরকে অর্থবহ করে তোলে। এছাড়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে জনগণও সন্তুষ্ট থাকবে।
অধিবেশনে এটি একই—অসামঞ্জস্যপূর্ণ বহর ও সীমিত আসনের বাস্তবতা স্পষ্ট। জনগণকে তথ্যপ্রাপ্ত রাখা এবং বাজেটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সফর আরও কার্যকর, অর্থবহ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
খসরু খান
লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।
