সিঙ্গাপুর—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। আয়তনে মাত্র ৭২৮ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে শূন্য বলা যায়। এমনকি পানীয় জলও তাদের নিজেদের নেই, পাশের দেশ মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ক্ষুদ্র দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো—সবক্ষেত্রেই সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সিঙ্গাপুর। প্রশ্ন জাগে, এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে তারা কিভাবে এমন বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করল?
সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট স্বাধীনতা লাভ করে। মূলত মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দেশটির যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তা ও শঙ্কায় ভরা। শিল্প নেই, কৃষি নেই, প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, চারদিকে শুধু অস্থিরতা। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, এই ছোট্ট দেশ রাষ্ট্র হিসেবে টিকতে পারবে না। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন পথ দেখাল।
সেই সময় নেতৃত্বে ছিলেন লি কুয়ান ইউ—সিঙ্গাপুরের জনক। তিনি জানতেন, সিঙ্গাপুরের হাতে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, কিন্তু আছে মানুষ। তাই তিনি মানুষের মধ্যেই শক্তি খুঁজে নিয়েছিলেন। কঠোর শৃঙ্খলা, সততা, দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স, এবং সর্বোপরি যোগ্যতা নির্ভর প্রশাসন গড়ে তুলে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়, ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়। শিল্পায়ন ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলে সিঙ্গাপুরকে বানানো হয় এশিয়ার ‘ট্রেড হাব’।
সিঙ্গাপুরের উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সুশাসন ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। লি কুয়ান ইউ শুধু নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। তিনি বুঝেছিলেন, উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের মানসিকতা, মননশীলতা, শৃঙ্খলা ও সততা। তাই তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে এমনভাবে দাঁড় করালেন যেখানে দুর্নীতি করার সাহস কেউ পায় না, আইন মানা সবার অভ্যাসে পরিণত হয়।
আজকের সিঙ্গাপুর প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে রোল মডেল। একসময় যাদের কাজ ছিল শ্রম রপ্তানি, সেই সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি। এই পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতি, সততা এবং দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—সিঙ্গাপুর থেকে অনেক গুণ বড় বাংলাদেশ, আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, উর্বর জমি আছে, খনিজ সম্পদ আছে, সমুদ্র আছে, নদী আছে—সবই আছে। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশ কেন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি? আমাদের মূল সমস্যা কোথায়?
প্রথমত, আমাদের নেতৃত্বের ধারাবাহিক সংকট। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলাদলি, ক্ষমতা দখলের লড়াই—এসবের কারণে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলেছে। যেখানে সিঙ্গাপুরে দুর্নীতির শাস্তি কঠোর, বাংলাদেশে দুর্নীতি যেন পুরস্কৃত হয়। তৃতীয়ত, শৃঙ্খলার অভাব। আমরা নিয়ম মানতে চাই না, আইনকে মানতে চাই না, দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাই।
বাংলাদেশে সম্পদের অভাব নেই, মানুষের অভাব নেই, বরং সবকিছু থাকার পরও অভাব হলো সুশাসন ও সঠিক নেতৃত্বের। আমাদের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম বিদেশে গিয়ে মেধার পরিচয় দিচ্ছে, কিন্তু দেশে এসে তারা সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর প্রতিটি নাগরিককে দেশের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। আজ বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হলো—উন্নয়ন কখনো সম্পদের ওপর নির্ভর করে না, উন্নয়ন নির্ভর করে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বের সততা, এবং নাগরিকদের শৃঙ্খলার ওপর। সিঙ্গাপুর যদি শূন্য থেকে শুরু করে বিশ্বের শীর্ষে উঠতে পারে, তবে বাংলাদেশও পারে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন সৎ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ।
আজ আমরা দেখছি, সিঙ্গাপুর এগিয়ে গেল, আর আমরা পিছনে রয়ে গেলাম। উন্নয়ন আসে সম্পদ থেকে নয়, সততা ও শৃঙ্খলা থেকে। সঠিক নেতৃত্বই পারে একটি দেশকে বদলে দিতে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে, অভাব শুধু সুশাসনের। শৃঙ্খলা, সততা আর দৃষ্টিভঙ্গি—এই তিনেই উন্নতির রহস্য।
খসরু খান
লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।
