বুধবার | মার্চ ৪ | ২০২৬

শ্রীলঙ্কার উপকূলে ভয়াবহ এক কার্গো জাহাজ দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত প্রভাব নিয়ে বিবিসি আজ একটি বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। লিয়ানা হোসেয়া ও সরোজ পাথিরানা কর্তৃক প্রস্তুত করা প্রতিবেদনটি শ্রীলঙ্কার নেগোম্বো থেকে প্রেরিত, যেখানে এখনো পর্যন্ত ২০২১ সালের ‘এক্স-প্রেস পার্ল’ দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে— সৈকতে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক কণা থেকে শুরু করে সামুদ্রিক পরিবেশের জটিল দূষণ পর্যন্ত। সংবাদপ্রবাহের পাঠকদের জন্য বিবিসির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি আজই বাংলায় অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো।

বিবিসি অনুসন্ধান
শ্রীলঙ্কার উপকূলে কার্গো জাহাজ দুর্ঘটনায় বাড়ছে বিপর্যয়

চার বছর কেটে গেছে, তবুও শ্রীলঙ্কার সৈকতে স্বেচ্ছাসেবকরা এখনও বালির ভেতর থেকে কিলোগ্রাম পরিমাণ ক্ষুদ্র ও বিষাক্ত প্লাস্টিক কণা খুঁজে বের করছেন,  যেগুলো ২০২১ সালের এক ভয়াবহ কার্গো জাহাজ দুর্ঘটনার ফলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ইউরিয়া আকৃতির এই প্লাস্টিক কণাগুলোর নাম “নার্ডলস”। ‘এক্স-প্রেস পার্ল’ নামের জাহাজটি যখন বিধ্বস্ত হয়, তখন এটির সঙ্গে টনকে টন ইঞ্জিন তেল, অ্যাসিড, সোডা, সীসা, তামার বর্জ্য, লিথিয়াম ব্যাটারি ও ইপক্সি রেজিন সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এসব উপাদানগুলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বিষাক্ত। ফলে তৎক্ষণিক প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। ঘটনার পরপরই উপকূলজুড়ে নার্ডলস ছড়িয়ে পড়েছিল, যেন সাদা বরফের স্তর। মৃত কচ্ছপ, ডলফিন ও মাছ ভেসে উঠছিল সৈকতে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হতে পারে আগের ধারণার চেয়েও ভয়াবহ। এখন পর্যন্ত শত শত মিলিয়ন নার্ডলস সংগ্রহ করা হলেও, বাকিগুলো বালির নিচে ঢুকে গিয়েছে। ফলে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে এই নার্ডলসগুলো আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

“এগুলো যেন একেকটা রাসায়নিক স্পঞ্জে পরিণত হয়েছে,” বলছেন ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ডেভিড মেগসন।

নার্ডলস হলো প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল, যেগুলো গলিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হয়। সাধারণত এগুলোর বিপুল পরিমাণ পরিবহন করা হয় বিশ্বব্যাপী।

‘এক্স-প্রেস পার্ল’ জাহাজে কী ঘটেছিল?
দুবাই বন্দর থেকে মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্ল্যাং বন্দরের পথে রওনা হওয়ার পর জাহাজের এক কন্টেইনারে নাইট্রিক অ্যাসিড লিক হতে শুরু করে, যা ধাতব কন্টেইনারটিকে ক্ষয় করতে থাকে।

কাতার ও ভারতের বন্দরগুলো অ্যাসিডবাহী ধোঁয়াটে ও ঝুঁকিপূর্ণ কন্টেইনারটি আনলোড করার অনুমতি দেয়নি।

২০২১ সালের ১৯ মে রাতে, যখন জাহাজটি শ্রীলঙ্কার জলসীমায় প্রবেশ করে, তখন কমপক্ষে আট দিন ধরে প্রতি ঘণ্টায় এক লিটার হারে অ্যাসিড লিক হচ্ছিল।

জরুরি নোঙরের অনুরোধ জানানো হয়, কিন্তু সকালে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। দুই সপ্তাহের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় জাহাজটি ডুবে যায়।

এর পর যা ঘটেছিল তা “যুদ্ধের সিনেমার মতো” ছিল বলে বর্ণনা দেন পরিবেশবাদী মুদিথা কাটুয়াওয়ালা, যিনি ‘দ্য পার্ল প্রটেক্টরস’ নামের স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।

তিনি বলেন, “কচ্ছপের গায়ে পোড়ার দাগ, খোলস খুলে যাওয়া, চোখ-মুখ ফুলে থাকা— এসব দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তারা ভয়ানক কষ্টে আছে।”

শুরুতে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিদিন ৩০০-৪০০ কেজি নার্ডলস সংগ্রহ করছিলেন। ধীরে ধীরে তা কমে আসে দিনে মাত্র ৩ থেকে ৪ কেজিতে, কারণ কণাগুলো বালির গভীরে মিশে যাচ্ছিল।

“পরিশেষে, হিসাব করে দেখা যায় যে এই বিশাল শ্রম আর স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনার লাভ-ক্ষতির ভারসাম্য আর থাকে না,” বলেন কাটুয়াওয়ালা। এরপর পরিষ্কারের দায়িত্ব পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চলে যায়।

আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে প্লাস্টিক
বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন যে, পরিবেশে পড়ে থাকা এই প্লাস্টিক কণাগুলো ধীরে ধীরে সমুদ্রের অন্যান্য দূষণ শোষণ করে আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বিবিসি ও ওয়াটারশেড ইনভেস্টিগেশনস একযোগে ২০টির বেশি প্লাস্টিক কণার নমুনা পাঠায় ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক রসায়নবিদদের কাছে।

তারা দেখতে পান, আগুনে পুড়ে যাওয়া নার্ডলসগুলোর মধ্যে বিষাক্ত ধাতু— যেমন আর্সেনিক, সীসা, ক্যাডমিয়াম, তামা, কোবাল্ট ও নিকেল বের হয়ে আসছে, যা সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য মারাত্মক।

কিছু মাছের মধ্যে সেই একই বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে, যেগুলো জাহাজের কার্গোতে ছিল এবং নার্ডলসে শোষিত হয়েছিল।গবেষকদের মতে, যদিও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি, তবুও জাহাজ দুর্ঘটনার সঙ্গে এই দূষণের সরাসরি সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি।

“এই দূষণ মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যারা এই সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল,” বলেন গবেষক মেগসন।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, “জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর থেকে আর আগের মতো মাছ পাই না,” বলেন জেলে জুডে সুলান্তা।

“অনেকেই নৌকা বিক্রি করে বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমার ছেলেও এখন জেলে, কিন্তু সেও বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছে। যদি ন্যায়বিচার পেতাম, এতদিনে পেয়ে যেতাম,” তিনি বলেন।

জাহাজ মালিকপক্ষ কী বলছে?
জাহাজের মালিক এক্স-প্রেস ফিডার লিমিটেড (X-Press Feeders Ltd) দাবি করেছে, তারা ইতোমধ্যে সাগরের ধ্বংসাবশেষ অপসারণে ১৩ কোটি ডলার এবং তটরেখা পরিষ্কারে শ্রীলঙ্কা সরকারকে ২ কোটির বেশি ডলার দিয়েছে।

তবে তারা বলছে, উপকূলীয় পরিষ্কারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকার নিয়েছে এবং সরকারিভাবে যে বিলম্ব হচ্ছে, তা দুর্ভাগ্যজনক।

শ্রীলঙ্কা সরকার বলছে, আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে তারা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না এবং সে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছে।

এপ্রিল ২০২৫-এ শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ আদালত প্রাথমিকভাবে ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেয়। কিন্তু আদালতের এখতিয়ার সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত নয়। উল্লেখ্য এক্স ফিডারস সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজ এবং এর সদরে দপ্তর একই দেশে।

জাহাজ মালিকপক্ষ এই রায় নিয়ে “চরম হতাশা” প্রকাশ করেছে এবং বলছে, তারা এখন আইনজীবী, বীমা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করছে।

দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষতি কত?
পরিবেশ অর্থনীতিবিদ প্রফেসর প্রশান্তি গুনারত্না, যিনি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির নেতৃত্ব দেন, বলেন— এই বিপর্যয়ের প্রকৃত ক্ষতি ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

তিনি জানান, “জাহাজে আগুন লাগার ফলে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ডাইঅক্সিন ও ফুরান ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। আমরা হিসাব করে দেখেছি, এর ফলে দেশে প্রায় ৭০ জনের মৃত্যু হতে পারে,” বলেন গুনারত্না।

তবে জাহাজ মালিকপক্ষ এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে এটি যথাযথ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির অভাব রয়েছে।

সমুদ্র এই দ্বীপরাষ্ট্রের প্রাণভোমরা। এর উপকূল পর্যটন ও মাছ ধরার মাধ্যমে দেশের জীবিকা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু এখন অনেকের কাছেই এটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নাম।

Share.
Exit mobile version