সোমবার | আগস্ট ৩১ | ২০২৬
মৃত্যুর প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল সন্ন্যাসের পথে। তিনি অকপটে বলেন, ‘একজন যুবক যেভাবে কোনো একজন যুবতীর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয় ও ভালোবাসে, আমিও সেভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসি।’ এই মৃত্যুপ্রেম নিয়েও তিনি জীবনের গান গাইছেন নিজের মতো করে। নিজেকে তিনি ঠিক লেখক দাবি করেন না। তাঁর ভাষায়, লেখকসত্তা তাঁর পাঠকসত্তার সম্প্রসারণ। সে অর্থে লেখালেখি তাঁর পাঠকসত্তার যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। যন্ত্রণা অথবা পরমানন্দের! সে তর্কে না গিয়ে, আমরা বরং বুঁদ হয়ে থাকি তাঁর সৃষ্টিতে, আনন্দে অবগাহন করি তাঁর শব্দে। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি আলাদা জাতবিচার মানেন না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতকে দাঁড় করান এক সমতলে। এবং নিশ্চিতভাবেই অতীত ছুঁয়ে, বর্তমান পেরিয়ে, বাংলা সাহিত্যের আগামীতে নিজের নাম খোদাই করেন-স্বকীয় মৃদুভাষণে। তিনি সন্মাত্রানন্দ। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দৃষ্টি নিয়ে কথা বলতে ‘দৈনিক সংবাদ প্রবাহ’র পক্ষ থেকে মুখোমুখি হয়েছেন- কাজী বনফুল।
কাজী বনফুল – আপনি ইতিমধ্যে সন্মাত্রান্দ শোভন থেকে সকলের মহারাজ হয়ে উঠেছেন। আপনাকে সেই মহারাজ ভূষণে সম্বোধন করে
প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাইবো আপনার লেখক সত্তা সৃজনের গোড়ার কথা?
সন্মাত্রানন্দ –  এই ‘মহারাজ’ সম্বোধন আমার খুব পছন্দের নয়। যেহেতু আমি বিশ বছর একটি সন্ন্যাসী সঙ্ঘের সদস্য ছিলাম, তাই এখনও কেউ কেউ আমাকে ওরকম সম্বোধন করে থাকেন। যেমন অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর প্রধানকেও কেউ কেউ ব্রিগেডিয়ার বা ক্যাপ্টেন বলে সম্বোধন করে থাকেন, এটাও ওরকমই। পরিবর্তে আমাকে ‘শোভনদা’, ‘শোভনবাবু’, ‘শোভন’–যা খুশি বলা যেতে পারে। সেটাই সহজ ও স্বাভাবিক।
আমার লেখকসত্তা আমার পাঠকসত্তারই সম্প্রসারণ। আমি নিজেকে একজন পাঠক বলেই মনে করি। লেখক নই। বিশ্বসাহিত্যের একজন পাঠক হিসেবে আমার পড়াশোনাকে কেন্দ্র করে যে-চিন্তাস্রোতের জন্ম হয়ে থাকে, সেই চিন্তাগুলোকেই আখ্যানের আকারে লিখতে চেয়েছিলাম। এর থেকেই আমার গল্প, উপন্যাসের জন্ম। যদি আপনারা আমাকে একান্তই লেখক বলতে চান, তাহলে এটুকুই আমার লেখকসত্তার গোড়ার কথা।
কাজী বনফুল – আমাদের ভারতবর্ষ ও পূর্ব বাংলার বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জের সন্তান সিদ্ধপুরুষ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবনীগ্রন্থ নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা রচনা করেছেন। যেটা ইতিহাসের এক মহামূল্যবান সম্পদ। এই গ্রন্থটি রচনার  প্রয়াস কীভাবে আপনার ভেতর জাগ্রত হলো এবং গ্রন্থটি রচনার সময়কার নানান দিক যা কোথাও বলা হয়নি সেগুলো যদি আমাদের জানাতেন।
সন্মাত্রানন্দ – বাঙালি হিসেবে বরাবর অতীশ দীপংকরের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই আমি শরচ্চন্দ্র দাস-এর লেখা ‘ইন্ডিয়ান পণ্ডিতস ইন দ্য ল্যান্ড অফ দ্য স্নো, অলকা চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘অতীশ অ্যান্ড টিবেট’, দীনেশচন্দ্র সেনের লেখা ‘বৃহৎ বঙ্গ’, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের লেখা ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’, আমার বন্ধু প্রিয়ঙ্কু চক্রবর্তীর সূত্রে পাওয়া বহু তিব্বতি গ্রন্থ এবং আমার বাংলাদেশ-নিবাসী বন্ধু অরুণকান্তি পালের সহায়তায় বিক্রমপুরের ভাষারীতি ইত্যাদি অধ্যয়ন করেছিলাম প্রায় দশ বছর ধরে। তখন উপন্যাস লেখার তেমন ইচ্ছে ছিল না। পরে একটি সুদীর্ঘ কবিতা লিখতে গিয়ে আমার ভাবনাগুলোকে উপন্যাসের আকারে লেখার ইচ্ছে হয়। এর থেকেই ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ উপন্যাসের জন্ম হয়।
কাজী বনফুল – আপনি সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসের পথে পা বাড়িয়ে ছিলেন সেই ভরন্ত যৌবনে। কীভাবে আপনার ভেতর এই সন্ন্যাস জীবনে প্রবেশের আগ্রহ সৃষ্টি হলো বা কে আপনার ভেতর গেঁথে দিলো সেই প্রেম জাদু এবং সন্ন্যাস জীবনের নানান অভিজ্ঞতা?
সন্মাত্রানন্দ – মৃত্যুর প্রতি সুগভীর ভালোবাসাই আমাকে সন্ন্যাসের পথে নিয়ে যায়। একজন যুবক যেভাবে কোনো একজন যুবতীর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয় ও ভালোবাসে, আমিও সেভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসি। প্রেমে আবদ্ধ কোনো যুবক যেভাবে প্রেমের উপাখ্যান পড়তে ভালোবাসে, মৃত্যুপ্রেমিক আমিও সেভাবেই শ্রীবুদ্ধ, আচার্য শঙ্কর, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও রচনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। এছাড়া আমাকে সবিশেষ অনুপ্রাণিত করেছিলেন আমার পূজনীয় গুরুদেব শ্রীমৎ স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী মহারাজ।
কাজী বনফুল – আপনার উপন্যাসকে মাঝে মাঝে কবিতা মনে হয়। কবিতার মত করে পাঠ করি। কীভাবে উপন্যাস এমন করে কবিতা হয়ে উঠতে পারে?
সন্মাত্রানন্দ- আমি যেহেতু কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি আলাদা আলাদা জাতিবিচার মানি না, ফলে হয়তো আমার উপন্যাস-অভিধায় অভিহিত রচনায় কবিতা-চিহ্নে চিহ্নিত রচনাসকলের আভাস পাওয়া যায়। আমার মতে, একটি রচনা কবিতা কি উপন্যাস, এরকম শ্রেণীবিভাগ না-করে তার থেকে যদি আনন্দ পাওয়া যায়, তবে সেটাই কাম্য।
কাজী বনফুল – আমরা জানি মনু নদী আপনার সবচেয়ে প্রিয় নদী কীভাবে সে এমন করে প্রিয় হয়ে উঠলো তার পেছনের কারণটা আসলে কী?
সন্মাত্রানন্দ – কীভাবে কেউ কারও প্রিয় হয়ে ওঠে, তা কি বলা যায়? মনুনদী অতি প্রাচীন; সুপ্রাচীন বায়ুপুরাণে এর উল্লেখ আছে। বিস্মৃতপ্রায় অতীত থেকে বর্তমান কালে তা প্রবাহিত। ভারত ও বাংলাদেশ–উভয় দেশের ভূভাগের উপর দিয়ে তা প্রবাহিত। এভাবে স্থান ও কাল অতিক্রমণের শক্তি নদীটির আছে, তাই আমি মনুনদীকে ভালোবাসি।
কাজী বনফুল – আপনি তো জীবনকে নানা আঙ্গিকে অনু বিশ্লেষণ করেছেন। জীবনের নানান দিক নানান ভাবে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। জীবন আসলে কী এবং আপনার জীবন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা যদি বলতেন?
সন্মাত্রানন্দ – আমার মতে জীবন হল অবধারিত মৃত্যুকে একটা নির্দিষ্ট মরশুম অবধি ঠেকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা। সেই মানুষের জীবনই মহান, যিনি অনিবার্য মরণকে মনে রেখে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে জীবনের সমস্ত উপভোগ্য বস্তুগুলিকে অন্য সকলের সেবায় উৎসর্গ করেন। কিংবা এমন করার চেষ্টা করে থাকেন।
কাজী বনফুল – মহাপুরুষ গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে রচনা করেছেন “তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি” নামক অমর সৃষ্টি। এই গ্রন্থটি  সম্পর্কে পাঠকদের অনেক কৌতূহল। ব্যক্তিগত ভাবে আমারও অনেক পছন্দের বই এটি। বইটির জন্মকাল থেকে যাত্রা ও বিশেষ কোন বিষয় যদি থাকে আমাদের বলুন।
সন্মাত্রানন্দ – ক্লাস থ্রি-তে পড়ার সময় থেকেই আমি বুদ্ধের কথা জানি। তাঁর সাধনজীবন আমার অত্যন্ত প্রিয়। এভাবে ভাবতে ভাবতে কুমার সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ, তপস্যা ও বোধিলাভের যে-চিত্র আমার মনে সুদৃঢ় রেখায় আঁকা হয়ে গেছে, তার থেকে আমি যে ‘ব্যক্তিগত বুদ্ধ’-এর ধারণা পেয়েছি, যাঁর সঙ্গে আমি কথা বলি, যাঁকে আমি নানা তর্কে টেনে নামানোর বিফল প্রয়াস করে চলি, ‘তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি’ বইটি সেই সব চেষ্টা, অনুরাগ ও ব্যর্থতার ফলাফল।
কাজী বনফুল – পাঁচটি প্রিয় চলচ্চিত্র, পাঁচটি প্রিয় বই?
সন্মাত্রানন্দ- চলচ্চিত্র:
‘ড্রিমস’–আকিরা কুরোশওয়া
‘সুবর্ণরেখা’– ঋত্বিককুমার ঘটক
‘মণিহারা’–সত্যজিৎ রায়
‘এক ডক্টর কি মওত’–তপন সিংহ
‘মাটির ময়না’–তারেক মাসুদ
বই:
‘শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ’– স্বামী সারদানন্দ
‘জ্ঞানযোগ’–স্বামী বিবেকানন্দ
‘গল্পগুচ্ছ’–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘ইছামতী’–বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘মাল্যবান’–জীবনানন্দ দাশ
কাজী বনফুল – দৈনিক সংবাদ প্রবাহের মাধ্যমে যদি আপনার পাঠকদের কিছু বলতে চান-
সন্মাত্রানন্দ- আসুন, আমরা আরও পড়ি। নতুন কিছু বিষয়ের দিকে আমাদের আগ্রহ ধাবিত হোক। আসুন, আমরা আরও বেশি ভালোবাসি মানুষকে, প্রকৃতিকে। আসুন, আমরা ব্যর্থ করে দিই পৃথিবী বিভাজনের সকল প্রয়াসকে। বাংলাদেশের জন্য অনেক প্রীতি ও ভালোবাসা রইলো।
Share.
Exit mobile version