কাফরুলে যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানেজানা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে ইউসুফ নয়, অভিযুক্ত কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম–আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনির মূল টার্গেটছিলেন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব ও আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন(ডিএনসিসি) নির্বাচনের কাউন্সিলর প্রার্থী হাফিজুল ইসলাম বাবু।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হাফিজ উদ্দিনহাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহযোগীতা করেছেন সাব্বিরদেওয়ান জনি।জনিকে গ্রেফতার করলেই এ হত্যাকাণ্ডের রহস্যজট বেরিয়ে আসবে বলে মনেকরেন ইউসূফের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী।
জানা যায়, নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের জেরে বাবুর আগেও জনির রোষের শিকার হয়েছেনআরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থী। ডিএনসিসি নির্বাচনে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী হওয়ায় গত ৯ জুনহামলার শিকার হন কাফরুল থানা বিএনপির ৪ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সিনিয়র সহসভাপতিহাজী ছাইফুল ইসলাম। ২৪ জুলাই একই ওয়ার্ডের প্রার্থী হাফিজুল ইসলাম বাবুকেও ভাড়াটেখুনির মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালান জনি।
হাফিজুল ইসলাম বাবু বলেন, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) প্রার্থী হওয়ারঘোষণাই আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থিতা ঘোষণার পরপরই আমি সাব্বিরদেওয়ান জনির রোষানলে পড়ে যাই। শুধু আমি নই, বিএনপি নেতা হাজী ছাইফুল ইসলামওনির্বাচনী দ্বন্দ্বে জনির রোষানলে পড়েছিলেন।
বাবুর দাবি, সাব্বির দেওয়ান জনির টার্গেট শুধু ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা।আমাদের পরও যারাই এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেবে, তাদের ওপরওহামলা হবে। জনি এই ওয়ার্ডে অন্য কাউকে প্রার্থী হতে দেবে না।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হাজী ছাইফুলের সঙ্গে জনির দ্বন্দ্ব আরও পুরনো। ২০২০ সালে স্থানীয়সরকার নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন হাজী ছাইফুল। সেই নির্বাচনেসাব্বির দেওয়ান জনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। সেই নির্বাচনে প্রার্থিতা তুলে নেওয়ার কথা বলেহাজী ছাইফুলের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেয় জনি, কিন্তু প্রার্থিতা তুলে না নিয়ে নির্বাচনেঅংশ নেন। পরবর্তীতে তাদের দ্বন্দ্ব আরও বাড়ে। এরই জেরে জনি যখন জানতে পারেনএবারের নির্বাচনেও হাজী ছাইফুল প্রার্থী হয়েছেন, তখন তিনি ছাইফুলের ওপর বর্বরোচিতহামলা চালান।
হাজী ছাইফুল ইসলামের ছোট ভাই ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা হাজী আলী হোসেনছিলেন এলাকার সম্মানিত ব্যাক্তি। তার নামে এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমারবড় ভাই হাজী রফিকুল ইসলাম এই ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। আমারআরেক ভাই হাজী ছাইফুল ২০২০ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।
তিনি আরও জানান, আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন হাজী ছাইফুলইসলাম। এ কারণে গত ৯ জুন তাকে হত্যার চেষ্টা চালায় জনির সন্ত্রাসী বাহিনী। আমি নিজেওসেই হামলার শিকার হয়েছি। ওই ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। মূলতএকই ওয়ার্ডের প্রার্থী হওয়ায় ছাইফুলের ওপর হামলা চালায় জনি, দাবি ওবায়দুলের।
অভিযোগের বিষয়ে সাব্বির দেওয়ান জনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি যদি অপরাধী হতাম এলাকায় থাকতাম না, পালিয়েথাকতাম। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে আসল খুনিদের শাস্তির দাবিজানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, সেদিনের ঘটনায় আমি হাজী ছাইফুলকে ফোন করি। কিন্তু তিনি ফোনধরেননি। এ কারণে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গেআমার বাক্বিতণ্ডা হয়েছে কিন্তু আমি কোনো হামলা করিনি।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ জুলাই রাতে মিরপুর ১৩ নম্বরের বয়রাপট্টি এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলারশিকার হন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু। ওই ঘটনায় নিহত হনযুবদলকর্মী ইউসুফ। আহত হন স্থানীয় দুইজন। পরবর্তীতে হামলার ঘটনায় মামলা হয় এবংজড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে, ওই ঘটনায় কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হাফিজ উদ্দিন হাফিজওরফে সিএনজি হাফিজের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তবে ঘটনার পর থেকেই তিনিউধাও। এই হাফিজসহ বিএনপিতে অনুপ্রবেশকারী বেশকিছু সন্ত্রাসীকে আশ্রয়–প্রশ্রয়দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাব্বির দেওয়ান জনির বিরুদ্ধে।
নির্বাচনী দ্বন্দ্বের জেরে সিএনজি হাফিজের মাধ্যমে খুনি ভাড়া করে জনিই হামলা চালিয়েছেবলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী হাফিজুল ইসলাম বাবু। এই হামলার পেছনের মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাসহ জড়িতদের খুঁজে বের করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতেসংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
হাফিজুল ইসলাম বাবুর ওপর হামলার প্রতিবাদ ও ইউসুফ হত্যার বিচারের দাবিতে মিছিলকরেছে কাফরুল থানা যুবদলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণ। শুক্রবার (১ আগস্ট) রাজধানীরমিরপুর–১৩ নম্বরে হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে বিশাল এ মিছিল হয়।
যুবদলকর্মী ইউসুফ হত্যা মামলা প্রসঙ্গে ডিএমপির মিরপুর জোনের উপ–কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার বলেন, মামলাটি এখনো ডিবি কর্তৃক তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্তকোনো মন্তব্য করা যাবে না।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই রায়হান জানান, ইউসুফ হত্যায় দুটিমামলা হয়েছে, একটি হত্যা মামলা যেটা ডিবি তদন্ত করছে, অন্যটি অস্ত্র মামলা যা কাফরুলথানা পুলিশ তদন্ত করছে। অন্য একটি প্রশ্নের জবাবে বলেন, হাজারও মানুষের দাবি হাজাররকম হতে পারে। তাই বলে সকলের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করতে হবে বা সকলের দাবিসমর্থনযোগ্য বক্তব্য দিতে হবে ব্যপারটা এমন না। আপনি দাবি করতেই পারেন বিষয়টা, কিন্তুসঠিক তদন্তের মাধ্যমে মূল আসামি শনাক্ত করা হবে।
কাফরুল থানার ওসি ছাইফুল ইসলাম জানান, ইউসুফ হত্যাকাণ্ডে হওয়া অস্ত্র মামলায়চঞ্চলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রথম দফা রিমান্ডে তিনি অসংলগ্ন কথা বলেছেন। একারণে আমরা অস্ত্রের কোনো তথ্য পাইনি। দ্বিতীয় দফায় তথ্যের জন্য আদালতের কাছেরিমান্ড আবেদন করা হবে।
