সোমবার | আগস্ট ৩১ | ২০২৬

শ্রাবণের সেই ভোরে কোথাও হয়তো মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল, কোথাও আকাশজুড়ে জমেছিল কালো মেঘ। কোথাও বা ঝুম বৃষ্টি ফোঁটায় রিনিঝিনি সুরে বাজছিল টিনের চাল। ১৯৭৫ সালের শ্রাবণের কাকডাকা সেই ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের বাড়িটিতে নেমে এসেছিল ইতিহাসের নির্মমতম অন্ধকার। সেই বাড়িটি, সেদিন সাক্ষী হয়েছিল ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞের। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ৩২ নাম্বারের সেই সিঁড়ি, যে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছিল বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসের এক মহীরুহের শেষ পদচিহ্ন। সেখানেই ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারান বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

৫১ বছর আগে সেই রাতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়াও স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, শেখ মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসেরকে হত্যা করে।

সেই রাতেই নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু; তার ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, মনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকট আত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টু।

সেদিন বাড়িতে থাকা পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান ও বঙ্গবন্ধুর প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসা নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান।

পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ইনডেমনিটি তথা দায়মুক্তি আইন করা হয়। দীর্ঘ ২১ বছর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বন্ধ রাখা হয়। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে ১৯৯৬ সালে মামলা দায়ের ও ইনডেমনিটি আইন বাতিলের পর বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে ফৌজদারি আদালতে। এই মামলায় ১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালত ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১০ সালে ১২ আসামির মধ্যে ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

আপাতদৃষ্টিতে খুনের বিচার হলেও, হত্যাকাণ্ডের পুরো প্রেক্ষাপট উন্মোচিত হয়েছে একথা যেমন বলা যায় না তেমনি নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন ও তাদের বিচারের আওতায় আনার কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা প্রচেষ্টাও দেখা যায়নি। সেটি ছাড়া বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে এমন দাবি স্রেফ প্রহসন বৈ কিছু নয়। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে এই হত্যাকাণ্ড এমন এক ব্যক্তির যিনি জীবদ্দশায় একটি নির্দিষ্ট আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান তথা বাংলাদেশের একজন সাধারণ  নাগরিক হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতির পিতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ধারার যে দর্শন সেটি হত্যার বিচার হয়নি। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লার কবিতায় আসা সেই কিংবদন্তির হত্যার বিচার হয়নি।

কেন হত্যা করো হলো জাতির পিতাকে? বিষয়টা এমন নয় যে মাথা গরম হয়ে গেল আর বঙ্গবন্ধুর মত একজন মানুষকে হত্যা করে ফেলল। এটা পরিকল্পিত ঠাণ্ডা মাথার খুন। আর এর পেছনে এমন কতগুলো ফ্যাক্টর জড়িত যার বিচার হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত উদঘাটন হয়নি।

প্রায়শই বলা হয় ‘কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য’ তাঁকে হত্যা করেছে। তবে এটি তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল, নাকি তারা কারো নির্দেশিত ভাড়াটে ঘাতক হিসেবে কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেছে সে রহস্য আজও অনুদঘাটিত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই চক্রান্তের আসল সত্য বের করার তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শোন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশনের প্রতিনিধিরা ১৯৮২ বা ১৯৮৩ সালের দিকে বাংলাদেশে আসতে চাইলে তৎকালীন এরশাদ সরকার তাদের ভিসা দেয়নি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও বিলেতের প্রবাসী উদ্যোক্তা বা কমিশন কেউই এ বিষয়ে আর এগোয়নি। হয়তো বঙ্গবন্ধু হত্যার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ায় মূল ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

১৫ আগস্ট কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না। যেমন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কেনেডি হত্যার বিচারে অসওয়াল্ড ও জ্যাক রুবির দৃষ্টান্ত থাকলেও তার গভীর তদন্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য চক্রান্ত নিয়ে আজও তেমন কোনো ব্যাপক অনুসন্ধানী গবেষণা দেখা যায়নি। না রাষ্ট্র, না সংগঠন, না কোনো বাক্তি বিষয়টি নিয়ে কেউ খুব বেশি অগ্রসর হননি।

পঁচাত্তরের মূল ঘাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সৈয়দ ফারুক রহমানের মতাদর্শগত অপব্যাখ্যা ও বিকৃত মানসিকতার এক চাঞ্চল্যকর গোপন নথি উন্মোচিত হয় ২০২০ সালে। ব্রিটেনের জাতীয় মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করা ১৯৭৬ সালের এই নথিতে তিনি দাবি করেন, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কারণেই তিনি শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিলেন।

দলিলটিতে ফারুক উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মূল চেতনা নাকি ছিল একটি ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ গঠন করা এবং এই প্রত্যাশাতেই জনগণ শেখ মুজিবকে নেতা মেনেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতা অনুসরণের কারণে তিনি শেখ মুজিবকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যা দেন। ফারুক নিজেকে ‘আল্লাহর প্রেরিত বান্দা’ দাবি করে এ হত্যাকাণ্ডের একক দায় স্বীকার করেন এবং এর জন্য কেবল আল্লাহর কাছেই জবাবদিহির কথা জানান।

ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের বঞ্চনাবোধ কিংবা দলিতদের নিচু জাত গণ্য করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় মিথ্যা ছিল না, কিন্তু সংকট তৈরি করেছিল ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি, এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল না। তবুও মুসলিম লীগ এবং পাশাপাশি আরএসএস ও হিন্দু মহাসভা উভয়েই এই ভুল তত্ত্বকে রাজনীতির কেন্দ্রে বসায়। অথচ স্বাধীনতার পর ভারত ধর্মভিত্তিক পরিচয় এড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক পথ বেছে নিলেও, পাকিস্তান গড়ে ওঠে পুরোপুরি এই ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে।

ইতিহাসে ‘পাকিস্তান’ নামের কোনো প্রাকৃতিক ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক সত্তা ছিল না। ফলে শুধু ধর্মকে রাষ্ট্রের একমাত্র ভিত্তি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি, যা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ও ভাষার টানকে উপেক্ষা করায় ধর্ম মানুষকে এক রাখতে পারেনি। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় পরিচয় নয় ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ই জাতি গঠনের আসল শক্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুসলিম লীগ ছেড়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে রূপান্তর এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধই এর বড় প্রমাণ। দ্বিজাতিতত্ত্বের এই অসারতা কেবল বাংলাদেশের জন্মেই প্রমাণিত হয়নি; কাশ্মির সংকট, দেশভাগের রক্তপাত এবং আজকের আধুনিক ভারতের ধর্মীয় রাজনীতির উসকানিতেও তা স্পষ্ট। অর্থাৎ  মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সুতরাং পঁচাত্তরের ঘাতক ফারুকের বঙ্গবন্ধু হত্যার যে তথ্য  বা যুক্তি উপস্থাপন করেছে তা অসার।

আবার অনেকেই বলেন, বাকশাল করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে আরেক খুনী মেজর ডালিম ফেসবুক লাইভে বলেছেন, ‘তাকে (বঙ্গবন্ধু) হত্যার নীলনকশা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে। কোরআন ছুঁয়ে শপথ করেছিলাম সবাই (হত্যাকারীরা)।’ আর বাকশাল হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি।

তাই প্রশ্ন হলো, হু কিলড মুজিব? আসলে, কে নয় কারা তাকে মেরেছে। রাজনৈতিক বিতর্ক বা বিবৃতিতে হরহামেশাই ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘বিদেশি সংশ্লিষ্টতা’র প্রসঙ্গ ওঠে, যার নেপথ্যে থাকে অপ্রীতিকর তথ্য প্রকাশের আশঙ্কা। লেখক ক্রিস্টোফার হিচেনস তাঁর দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার বইয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ বিশ্বজুড়ে একাধিক রাষ্ট্রপ্রধানের পতন ও হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার, সিআইএ এবং পেন্টাগনের ভূমিকা উন্মোচন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে সরাতে ব্যর্থ হয়ে জেনারেল শেনিডারকে হত্যা, কিংবা সাইপ্রাসের ম্যাকারিওস, ঘানার নক্রুমা, কঙ্গোর লুমুম্বা ও ইন্দনেশিয়ার সুকর্ণর ক্ষমতাচ্যুতিকে শুধুই স্থানীয় সামরিক বাহিনীর ‘উচ্চাভিলাষ’ বলা যায় না। হিচেনস চিলির ঘটনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের স্পষ্ট মিল খুঁজে পেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে স্বভাবতই যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ভূমিকা আলোচনার শীর্ষে আসে; পাশাপাশি চীন ও ভারতের সাউথ ব্লকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি নভেম্বরে অভ্যুত্থানের পর ঘাতকদের লিবিয়ায় দ্রুত ও নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার পেছনে পূর্বপরিকল্পিত কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল কি না, তা আজও রহস্যবৃত। হিচেনসেরও আগে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন বইয়ে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি ও বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তুলে ধরেন। একইভাবে তৎকালীন আমেরিকান কনসাল আর্চার ব্লাডের দ্য ব্রুটাল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়েও ১৯৭১-এর গণহত্যা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত আমেরিকার ভূমিকা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ১৯৭৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ঘাতকেরা ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, এমনকি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল। উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী, কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরকালেই মার্কিন দূতাবাসে ‘মুজিব-হত্যা’ সংক্রান্ত এক গোপন বৈঠক হয়। কংগ্রেস প্রতিনিধি সোলার্জের চিঠির জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, সাবেক সিআইএ প্রধানের সাক্ষ্যমতে বঙ্গবন্ধুর কাছে সম্ভাব্য ক্যু সম্পর্কে অগ্রিম সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। তবে ক্রিস্টোফার হিচেনসের দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, কিসিঞ্জারের ঢাকা ছাড়ার পরই মার্কিন দূতাবাসের একটি পক্ষ ক্যু-পরিকল্পনাকারী বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক শুরু করে।

অন্য দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গেও ঘাতকদের যোগাযোগ ছিল। ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট সাংবাদিক এবিএম মুসা গোপনে লন্ডনে যান। সেখান থেকে নভেম্বরের শুরুতে রাজিউল হাসান (রঞ্জু) ও পদত্যাগী রাষ্ট্রদূত আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিক এবিএম মুসাকে সুইডেনে নিয়ে যান। সেখানে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরো শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ল্যা এক্সপ্রেসেন পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সম্পাদক টমাস হ্যামবার্গের সঙ্গে সাংবাদিক এবিএম মুসার কয়েক দফা বৈঠক হয়। টমাস জানান, ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা বঙ্গবন্ধু হত্যার আগাম আভাস পেয়েছিলেন এবং ক্যু ব্যর্থ হলে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ঘাতকেরা অন্তত এক নম্বর অভিযুক্ত পাকিস্তানের সঙ্গেও আলোচনা করেছিল। ১৯৯১ সালে পাকিস্তান সফরকালে করাচির সাংবাদিক মিনহাজ বার্নার মাধ্যমে সাংবাদিক এবিএম মুসা জানতে পারেন, ১৫ আগস্ট ভোরেই জুলফিকার আলী ভুট্টো উল্লসিত হয়ে নিজ সচিবকে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর দেন, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে পাকিস্তান দূতাবাসই সরাসরি এই তথ্য পৌঁছে দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কৌঁসুলী অ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের ছেলে ও পরবর্তীকালের প্রসিকিউটর আনিসুল হকের কাছে সাংবাদিক এবিএম মুসা জানতে চেয়েছিলেন, বিচারে কেন বিদেশি রাষ্ট্র বা শক্তির ভূমিকা এড়ানো হলো? আনিসুল হক সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত দেন যে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাম আনলে বিচার বিলম্বিত হতো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। এমনকি ক্ষমতাসীন সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কের জন্যও তা বিব্রতকর হতো। তবে ফারুকের আইনজীবী আদালতে ‘থার্ড ফোর্স’ বা ‘তৃতীয় শক্তি’র যুক্ত থাকার কথা তুলেছিলেন, কিস্তু বিষয়টি আর এগোয়নি।

এগোয়নি কিন্তু ইতিহাসির স্বার্থেই  বিষয়টি নিয়ে এগোতে হবে। কারণ এই রহস্যগুলো উদঘাটনের উপর নির্ভর করছে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার বিষয়টি। একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি ও জাতির পিতা হত্যার পরও ষড়যন্ত্রকারীদের এভাবে পার পেতে দিলে আগামী প্রজন্ম নিশ্চিতভাবেই আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। অনেক উত্তর পাওয়া বাকিÑকিন্তু উত্তরগুলো পেতে হবে।

তথ্যসূত্র :

১। বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন – লিফত্শুলজ

২। ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার -ক্রিস্টোফার হিচেন্স

৩। মুজিব ভাই- এবিএম মুসা

৪। Inside the Company: CIA Diary – Philip Agee

৫। The Bangladesh Military Coup and the CIA Link – B.Z. Khasru

লেখক : গবেষক

Share.
Exit mobile version