বুধবার | মার্চ ৪ | ২০২৬
খসরু আহমেদ খান

প্রতিটি রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের শুরুটা একরকম হয় না, কিন্তু একটি মিল প্রায় সবখানেই থাকে—নারীর পদচারণা। প্রথম সারিতে থাকে ছাত্রী, তরুণী, গৃহবধূ, এমনকি কর্মজীবী নারীও। চোখেমুখে থাকে সাহসের দীপ্তি, হাতে থাকে প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে থাকে জ্বালাময়ী স্লোগান। তারা গলা উঁচিয়ে বলে— ‘আমরাও মানুষ, আমরাও অধিকার চাই।’ আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে তাদের বলা হয় ‘বাঘিনী’। পত্রিকার হেডলাইনে আসে “নারীর সাহসেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট”, কিংবা “বাঘিনীর গর্জনে কেঁপে উঠল রাজপথ”। এই প্রশংসা নিঃসন্দেহে প্রাপ্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বাঘিনীরা পরে কোথায় যায়? আন্দোলন থেমে গেলে, স্লোগানের শব্দ স্তব্ধ হলে, সংবাদমাধ্যম আর তাদের ছবি ছাপে না। মিডিয়ার ক্যামেরা ঘুরে যায় অন্যখানে, আর আন্দোলনের বাঘিনীরা হারিয়ে যান সময়ের স্রোতে। তারা হয়তো ফিরে যান রান্নাঘরে, হয়তো কর্মস্থলে, কেউ কেউ মানসিক হতাশা নিয়ে দীর্ঘদিন নিঃশব্দে বেঁচে থাকেন। অথচ, তাদের সেই সাহসিকতার জন্যই আন্দোলনটা হয়েছিল দৃশ্যমান। তখন পুরুষ নেতৃত্বের পেছনে তারা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অদৃশ্য শক্তি।

আন্দোলনের সময় নারী—শেষে কোথায় সে পরিচয়? প্রতিটি আন্দোলনের গল্পেই দেখা যায়—আন্দোলনের সময় নারীকে সামনে রাখা হয়, কারণ তার উপস্থিতি আন্দোলনকে আরও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়, পুলিশের রূঢ়তা কিছুটা কমিয়ে দেয়, এবং মিডিয়া সাড়া দেয় দ্রুত। কিন্তু এই উপস্থাপনাটা কি কৌশল ছিল শুধুই সাময়িক সুবিধার জন্য!

অনেক সময় দেখা যায়—একই আন্দোলনের পুরুষ মুখেরা পরবর্তীতে হয়ে যান সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা সংগঠনের কর্ণধার। কিন্তু যেই মেয়েটি বুক চিতিয়ে স্লোগান দিয়েছিল, রাস্তায় বসেছিল, লাঠিচার্জ সহ্য করেছিল—তার ভাগ্যে কিছুই জোটে না। কেউ হয়তো বলেন, “সে তো পড়াশোনা শেষ করে সংসার নিয়ে ব্যস্ত”, কেউ বলেন, “ওরা তো আবেগে এসেছিল।” অথচ ইতিহাস সাক্ষী, অনেক পুরুষও একই আবেগে এসেছিলেন, কিন্তু তাদের জন্যই তৈরি হয় সুযোগ, আর নারীদের জন্য তৈরি হয় বিস্মৃতির দেয়াল।

কেন তারা হারিয়ে যায়—এ দায় কার? এ দায় শুধুই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের? নাকি নেতৃত্বের ভেতরেই ছিল এক অদৃশ্য বৈষম্য? অনেক সময় আন্দোলনের ভেতরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব বণ্টন কিংবা মিডিয়ার ফোকাস—সবকিছুতেই থাকে নারীকে প্রান্তিক করে রাখার প্রবণতা।

তারা কেবল প্রতিবাদের মুখ হন, কিন্তু নীতিনির্ধারণের কণ্ঠ হতে পারেন না। একজন ছাত্রী কিংবা গৃহিণী, যখন বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু নিজেকে নয়, প্রজন্মকে সাহস দেখান। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সাহসিকতা ভুলে গেলে, তার হতাশা হয় দ্বিগুণ। কারণ, একজন সাহসী মানুষকে যখন চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাকে আর ফেরত পাওয়া যায় না।

সমাধানের পথেও নারীদের স্থায়িত্বে রাখা কি উচিত নয়? সমস্যা চিহ্নিত করাই শেষ নয়, সমাধানের দিকেও যেতে হবে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও নারী নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে। শুধু ‘বাঘিনী’ বললেই চলবে না—তাদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে এমন এক পরিসর, যেখানে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে পারবেন, এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ হতে পারবেন। নারীদের ভূমিকা যেন শুধুই প্রতিবাদের মুখচ্ছবি না হয়—তারা যেন প্রতিরোধের পর নেতৃত্বেও জায়গা পান।

যে সমাজ সাহসকে শুধু উৎসবমুখর প্রশংসায় সীমাবদ্ধ রাখে, কিন্তু প্রাত্যহিক ব্যবস্থায় তা স্থান দিতে চায় না—সে সমাজ ইতিহাস লিখতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ‘বাঘিনী’ শব্দটি যেন কেবল মিডিয়ার শিরোনাম না হয়, বরং হয়ে উঠুক নেতৃত্বের ধারা। সাহসিকতা যেন কেবল ফটো-ফ্রেমে বন্দি না থাকে, বরং স্থান পাক নীতি-নির্ধারণের টেবিলে। কারণ যারা সামনে থাকে বিপদের দিনে, তারাই সামনে থাকা উচিত আগামী দিনের পথচলায়ও।

নারী নেতৃত্ব যেন কোনো আন্দোলনের পরে বিস্মৃত ‘নারী-বাঘিনী’ নয়, বরং হয় সহযোগী নেতৃত্ব ও সমাজের অন্তর্ভুক্তি—নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আলোচিত বিষয়।

 

 

লেখক: কলামিস্ট

Share.
Exit mobile version