সোমবার | আগস্ট ৩১ | ২০২৬
 প্যারিসে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ই-পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনলাইন পোর্টালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গিয়ে অনেক আবেদনকারীকে মাসের পর মাস ‘নো স্লট অ্যাভেইলেবল’ বার্তা দেখতে হচ্ছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রিফেকচারে কাজের অনুমতি নবায়ন কিংবা বৈধতার কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। ফলে সময়মতো পাসপোর্টের আবেদন করতে না পারা অনেক প্রবাসীর জন্য তৈরি করছে বাড়তি অনিশ্চয়তা।
দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের মধ্যেই প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ ই-পাসপোর্ট সেবা ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ সেবার কয়েকটি দিনে সেবাপ্রার্থীর উপস্থিতিতে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। একদিকে ২৫ জুলাই ও ৮ আগস্টের বিশেষ সেবায় তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়েছেন, অন্যদিকে ১২ আগস্ট একই ধরনের সেবায় কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে দূতাবাস প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা। আবার এক সপ্তাহ পর ১৯ আগস্ট একই ধরনের সেবা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ জুলাই বিশেষ পাসপোর্ট সেবায় ৮৭ জন এবং ৮ আগস্ট ১০৮ জন সেবা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ প্রথম দুই দিনের বিশেষ সেবায় মোট ১৯৫ জনকে সেবা দেওয়া হয়। ৮ আগস্ট দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দূতাবাস প্রাঙ্গণে সরেজমিনেও তুলনামূলক ফাঁকা পরিবেশ দেখা যায়।
অথচ কমিউনিটিতে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই পাসপোর্ট সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রথম দিকের বিশেষ সেবায় উপস্থিতি কেন এত কম ছিল সেই প্রশ্ন তখন থেকেই তৈরি হয়। বিশেষ সেবার তথ্য সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছিল কি না, কিংবা অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবে পাসপোর্ট সেবা নেওয়ার চাহিদার কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন দেখা যায় ১২ আগস্ট বুধবার। সকাল থেকেই প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে ই-পাসপোর্ট সেবা নিতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী উপস্থিত হতে থাকেন। একপর্যায়ে দূতাবাস প্রাঙ্গণে কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে তৈরি হয় চাপ, ভিড় ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
দূতাবাসের হিসাবে, ওই দিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসা ২৮৭ জনকে ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ৪০ জন এবং অন্যান্য আরও ৪০ জনসহ মোট ৩৬৭ জনকে সেবা দেওয়া হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি-২৮৭ জনই সেদিন দূতাবাসে উপস্থিত ছিলেন, এমন নয়। বরং সেবা নিতে উপস্থিত কয়েকশ মানুষের মধ্যে দূতাবাসের হিসাবে ২৮৭ জনকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই সেবা দেওয়া হয়।
তবে সংখ্যার চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে সেদিনের পরিবেশ। কে আগে সেবা পাবেন, কার অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে আর কার নেই-এসব নিয়ে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ঘটনাস্থলে ফরাসি পুলিশের উপস্থিতিও দেখা যায়।
এর মধ্যে আরও বিব্রতকর একটি ঘটনা ঘটে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে আহত হয় ছয় বছরের একটি শিশু। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তারা আগে থেকেই দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন এবং নির্ধারিত সেবা নিতে এসেছিলেন। কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সেবা নিতে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ার পর একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কিতে শিশুটি মাটিতে পড়ে গিয়ে আহত হয়।
ঘটনাটি শুধু একটি দিনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেনি; ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এটি ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রশ্ন ওঠে-এত মানুষ একই সময়ে দূতাবাসে কীভাবে এসে হাজির হলেন? কয়েক দিন আগেও যেখানে বিশেষ সেবায় উপস্থিতি ছিল ১০৮ জন, সেখানে ১২ আগস্ট হঠাৎ কয়েকশ মানুষের উপস্থিতির কারণ কী?
এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে বিশেষ সেবার তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিশেষ সেবার তথ্য প্রচার করা হয়েছিল। তবে এর বাইরে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যপ্রবাহ, কমিউনিটির কোনো বিশেষ নেটওয়ার্ক কিংবা অন্য কোনো কারণে ওই দিনের উপস্থিতি বেড়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি।
তবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকটের প্রশ্নটি শুধু বিশেষ সেবার দিনের ভিড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ আবেদনকারীরা অনলাইনে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়ায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে চিহ্নিত করা দায়িত্বশীল হবে না। তবে অভিযোগগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। কারণ সাধারণ আবেদনকারী যদি নিয়মিতভাবে স্লট না পান, তাহলে একই সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কীভাবে নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংগ্রহ করছে-এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনলাইন ব্যবস্থায় একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার, অস্বাভাবিক দ্রুত বুকিং, ভুয়া তথ্য দিয়ে স্লট ধরে রাখা কিংবা প্রযুক্তিগত কোনো দুর্বলতা কাজে লাগানো হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব। একইভাবে কোনো তৃতীয় পক্ষ বট বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে দ্রুত স্লট দখল করছে কি না, একাধিক আইডি ব্যবহার করে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হচ্ছে কি না, কিংবা পরে সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্থের বিনিময়ে অন্যদের কাছে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না-এসব অভিযোগও প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
এ জন্য একটি স্বচ্ছ আইটি অডিট কার্যকর হতে পারে। গত কয়েক মাসে কতগুলো স্লট উন্মুক্ত হয়েছে, কতজন আবেদন করেছেন, কতজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন, কতগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল হয়েছে, বাতিল হওয়া স্লট কীভাবে পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে এবং একই ই-মেইল, ফোন নম্বর, আইপি বা ডিভাইস থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যক বুকিং হয়েছে কি না-এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে প্রকৃত চিত্রের একটি বড় অংশ সামনে আসতে পারে।
যদি কোনো অনিয়ম না থাকে, সেটিও পরিষ্কার হবে। আর যদি কোনো কারসাজি থেকে থাকে, তাহলে তার উৎস শনাক্ত করার পথও তৈরি হবে।
তবে সমস্যার পুরো দায় তৃতীয় পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমাধান হবে না। একটি সরকারি সেবা ব্যবস্থার দায়িত্ব হলো এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে সাধারণ মানুষকে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হবে না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা যদি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অন্যের সহায়তা নেন, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
১২ আগস্টের ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাগত বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ৪০ জন এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসা বিপুলসংখ্যক সেবাপ্রার্থী একই পরিবেশে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সামনে যখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ব্যক্তিদের নাম ধরে ভেতরে নেওয়া হচ্ছিল, তখন অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহ তৈরি হয়।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়, নাম ধরে ডাকা ওই ৪০ জন ছিলেন আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া নির্ধারিত সেবাগ্রহীতা এবং তারা দুই থেকে তিন মাস আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন। এই ব্যাখ্যা সঠিক হলেও আগে থেকেই আলাদা প্রবেশপথ, আলাদা লাইন কিংবা স্পষ্ট ঘোষণা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু সেবাপ্রার্থীদের আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সেবা ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য যোগাযোগের স্বচ্ছতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এর পরের সপ্তাহে চিত্র আবার বদলে যায়। ১৯ আগস্ট বুধবার আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া বিশেষ ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়া হয়। দূতাবাসের হিসাবে এদিন ১৯০ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে উপস্থিতিও ছিল আনুমানিক দুই শতাধিক।
তবে ১২ আগস্টের তুলনায় ১৯ আগস্টের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেবাপ্রার্থীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সেবা নেন এবং বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সেবাপ্রার্থীদের শৃঙ্খলিত উপস্থিতি থাকলে বিপুলসংখ্যক মানুষকেও তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশে সেবা দেওয়া সম্ভব ১৯ আগস্টের পরিস্থিতি অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিয়েছে।
দূতাবাসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সেবাপ্রার্থীরা ১৯ আগস্টের মতো সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে উপস্থিত হলে তাদের সেবা দেওয়া অনেক সহজ হয়। একই প্রত্যাশা আগের বিশেষ সেবাগুলোতে সেবা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের প্রতিও।
এখন পর্যন্ত উল্লিখিত চারটি বিশেষ সেবা কার্যক্রমে দূতাবাসের হিসাবে মোট ৭৫২ জন সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জুলাই ৮৭ জন, ৮ আগস্ট ১০৮ জন, ১২ আগস্ট ৩৬৭ জন এবং ১৯ আগস্ট ১৯০ জন।
তবে এই ৭৫২ জনকে আলাদা ৭৫২ জন ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি চার দিনের সেবা সংখ্যার যোগফল। বিশেষ করে ১২ আগস্টের ৩৬৭ জনের মধ্যে ২৮৭ জন ছিলেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সেবাগ্রহীতা, ৪০ জন আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া এবং আরও ৪০ জন অন্যান্য সেবাগ্রহীতা। ফলে সংখ্যাগুলো দিনের ভিত্তিতে দেওয়া সেবার হিসাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তাহলে প্রশ্ন হলো মূল জট আসলে কোথায়?
এর পেছনে থাকতে পারে দূতাবাসের সীমিত জনবল ও অবকাঠামো। থাকতে পারে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থার কারিগরি সীমাবদ্ধতা। থাকতে পারে তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি কিংবা সমন্বয়হীনতা। আবার প্রবাসীদের অভিযোগ সত্য হলে কোনো তৃতীয় পক্ষের অনৈতিক তৎপরতাও থাকতে পারে।
কোনটি প্রকৃত কারণ, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন তথ্য, স্বচ্ছতা এবং তদন্ত।
দূতাবাস চাইলে গত কয়েক মাসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কতটি স্লট দেওয়া হয়েছে, কতজন আবেদন করেছেন, কতজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন, কতজন পেয়েও উপস্থিত হননি, কতটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল হয়েছে এবং একই ব্যক্তি বা অ্যাকাউন্ট থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যক বুকিংয়ের কোনো নজির পাওয়া গেছে কি না এসব তথ্য সামনে এলে কমিউনিটিতে থাকা অনেক সন্দেহের অবসান হতে পারে।
একই সঙ্গে প্রবাসীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী না করা এবং বিশেষ সেবা নিতে গিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। কারণ ১৯ আগস্টের তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখিয়েছে, সেবাপ্রার্থী ও দূতাবাস উভয় পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ প্রবাসী। যিনি নিজে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চান, তিনি স্লট পান না। যিনি দূরবর্তী শহর থেকে প্যারিসে আসেন, তাকে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। যার ফরাসি প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে, তিনি পাসপোর্ট না পাওয়ার কারণে উদ্বেগে থাকেন। আবার বিশেষ সেবার আশায় দূতাবাসে এসে কখনো তাকে কয়েকশ মানুষের ভিড়ের মধ্যেও পড়তে হয়।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। অথচ নিজের দেশের একটি সরকারি নাগরিক সেবা নিতে বিদেশের মাটিতে তাদের এমন অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মুখে পড়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তাই এখন প্রয়োজন পারস্পরিক দায় চাপানোর বদলে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা। দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, অনলাইন সিস্টেমে কারিগরি সমস্যা থাকলে তা দূর করতে হবে, তথ্যের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টধারী এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসা সেবাপ্রার্থীদের জন্য পৃথক ও সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে একটি পক্ষের সেবা নিতে গিয়ে অন্য পক্ষ হয়রানির শিকার না হন।
আর যদি সত্যিই কোনো তৃতীয় পক্ষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ প্রবাসীদের হয়রানি বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে, তাহলে প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের নয়। প্রশ্নটি একটি সরকারি নাগরিক সেবার ওপর হাজারো প্রবাসীর আস্থার।
প্যারিসে ই-পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জট আসলে কোথায়- সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায়, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায়, তথ্যের ঘাটতিতে, নাকি এমন কোনো অদৃশ্য ব্যবস্থায়, যার সুযোগ নিয়ে বারবার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ প্রবাসীরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
Share.
Exit mobile version