সোমবার | আগস্ট ৩১ | ২০২৬

আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাবিধুর, কলঙ্কময় ও রক্তাক্ত একটি দিন। আজকের এই শ্রাবণের আকাশ যেন ১৯৭৫ সালের সেই ভোরের মতোই ভারী হয়ে আছে। ৫১ বছর আগে এই দিনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল রক্তের স্রোত। সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর শুধু একটি বাড়ির ঠিকানা নয়। এটি বাঙালি জাতির মুক্তির তীর্থস্থান, আমাদের ইতিহাসের সূতিকাগার। এই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল জানে একটি জাতির জন্মের ইতিহাস। এখান থেকেই ৭ই মার্চের ভাষণের খসড়া তৈরি হয়েছিল, এখান থেকেই এসেছিল অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, এখানেই বসে বঙ্গবন্ধু এঁকেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। যে বাড়িটি ছিল বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু, সেই বাড়িটিই ১৫ আগস্ট ভোররাতে হয়ে উঠেছিল জল্লাদের কসাইখানা।

আর টুঙ্গিপাড়া হলো সেই যাত্রার শুরু এবং শেষ। গোপালগঞ্জের মধুমতী নদীর তীরে ছায়াঘেরা টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট খোকা মুজিব কীভাবে ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু, সেই গল্পটি আসলে একটি জাতির বড় হয়ে ওঠার গল্প। টুঙ্গিপাড়ার মাটি ও মানুষের কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন সাধারণ মানুষকে ভালোবাসতে। আর জীবনের শেষে, সব ষড়যন্ত্র ও নৃশংসতাকে পেছনে ফেলে তিনি আবার ফিরে গেছেন সেই টুঙ্গিপাড়ার মাটিতেই। ধানমন্ডি ৩২ থেকে টুঙ্গিপাড়া – এই পথটি তাই শুধু একটি ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, এটি একটি ইতিহাসের পরিক্রমা।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা বা কয়েকজন বিপথগামী সেনা সদস্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ – মেজর ফারুক রহমান, মেজর আব্দুর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল রশিদসহ আরও কয়েকজন – ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া বহর নিয়ে ভোররাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তারা প্রথমে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। এরপর শেখ নাসেরকে। বঙ্গবন্ধু যখন নিচে নেমে এসে বলেছিলেন, “তোরা কী চাস?” – তখন ঘাতকরা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। সিঁড়ির উপরেই ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তাঁর বুক। সাথে সাথে শহীদ হন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। একে একে হত্যা করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং মাত্র দশ বছরের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকে। রাসেল কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “আমি মায়ের কাছে যাব।” কিন্তু পাষণ্ড ঘাতকদের হৃদয় গলেনি। মায়ের লাশের পাশেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই হত্যার নেপথ্যে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, যারা ১৯৭১-এর পরাজয় মেনে নিতে পারেনি, ছিল আন্তর্জাতিক শক্তির একটি অংশ যারা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ ও জোটনিরপেক্ষ নীতিকে পছন্দ করেনি, এবং ছিল ক্ষমতালোভী রাজনীতিক খন্দকার মোশতাকের মতো মীরজাফররা। হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের বিচার বন্ধ করে দেওয়াই প্রমাণ করে ষড়যন্ত্র কতটা গভীর ছিল।

ধানমন্ডি ৩২-এর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে দাঁড়ালে আজও রক্তের গন্ধ পাওয়া যায়, আর টুঙ্গিপাড়ার সমাধিতে গেলে মনে হয় পিতা ঘুমিয়ে আছেন। তিনি ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ জেগে আছে। বুলেট দিয়ে আদর্শকে হত্যা করা যায় না। আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার ধানমন্ডি ৩২ এর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে বুলডোজার দিয়ে। সেখা

আজকের শপথ হোক, শোককে শক্তিতে পরিণত করার। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সোনার বাংলা গড়াই হবে তাঁর প্রতি আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Share.
Exit mobile version