শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও নির্বাচনী হাওয়া বেশ জোরেশোরে বইতে শুরু করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। দলগুলোও তাদের প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে। চলছে জোট গঠনের আয়োজন।
এরই মধ্যে একটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নির্বাচন নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বিচার, সংস্কার, সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতি, গণপরিষদ এবং এমনই নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে নির্বাচনের সঙ্গে। এর ফলে জনমনে এমন প্রশ্নও উঠছে, ফেব্রুয়ারিতে আদৌ নির্বাচন হচ্ছে কি না।
পিআর পদ্ধতি নিয়ে বেশি সোচ্চার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত রবিবার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক সেমিনারে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং ভোটের আগে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বাধ্য করা হবে।
গত মঙ্গলবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে দলটির পক্ষে বলা হয়, জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি ও পিআর পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে নয়। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে এ দেশের মানুষ অভ্যস্ত না। তারা বোঝেও না, ঠিকমতো জানেও না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গত বুধবার বলেন, জনগণকে জিজ্ঞেস না করেই পিআর পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন সম্ভব নয়। কেবল নির্বাচিত সংসদই এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশে প্রচলিত আসনভিত্তিক ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতির পক্ষেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার, সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও বিকল্প সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির পক্ষে সুপারিশ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের আলোচ্যসূচিতেও সংসদের নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতির বিষয়টি স্থান পায়নি।
তা সত্ত্বেও দেশ যখন সাধারণ নির্বাচনের পথে এগিয়ে চলেছে, তখন এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টির অর্থ কী—রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ প্রসঙ্গে নানা ধরনের মতামত তুলে ধরছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, পিআর পদ্ধতি চালু করতে হলে প্রথমে দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে দলগুলো তো একমত নয়।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যেসব রাজনৈতিক দল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পক্ষে ছিল না, তারাই আবার নানা ধরনের অজুহাত তৈরি করে নির্বাচনকে পেছাতে চাইছে। কেউ কেউ মনে করে, এসব অজুহাত স্রেফ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির কৌশল মাত্র।
আমরা মনে করি, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যেতে হবে। এরপর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই নির্ধারণ করবে নির্বাচনপদ্ধতি কী হবে কিংবা সংবিধানে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এর আগে প্রচলিত পদ্ধতিতেই নির্বাচন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে।



