ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে বলা হয় অর্থনীতির ধারক ও বাহক। লাখ লাখ সঞ্চয়ীর মানুষের ভরসা হলো ব্যাংক। বিগত সময়ে এ খাতের আওতাও ক্রমেই বেড়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের গত দেড় দশকের শাসনামলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের ঘটনার কারণে ব্যাংক খাতের অবস্থা খবই নাজুক হয়ে পড়েছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বড় একটি অংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে অনেক ব্যাংকেরই ব্যবসায়িক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি কিছু ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এসব কারণে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে।
চলমান এ অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার সুযোগ নিচ্ছে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ও সমবায় সমিতি। স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে প্রথমে বিশ্বাস অর্জন, তারপর লাভের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয় এসব এমএলএম কোম্পানি ও সমিতি। দেশে বারবার এমএলএম কোম্পানি ও সমবায় সমিতিগুলোর প্রতারণার বিষয়টি সামনে এলেও কোনোভাবেই সেটি থামানো সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেবল জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায়ই গত এক বছরে ২৩টি সমবায় সমিতি হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সারা দেশে যথাযথভাবে অনুসন্ধান চালালে দেখা যাবে, এ আত্মসাতের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এসব কোম্পানি ও সমবায় সমিতির আর্থিক প্রতারণা বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা যত বাড়ছে, ততই সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকরা। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি না থাকলে এসব প্রতারণার শিকার হয়ে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমবায় সমিতিতে নাগরিকরা অর্থ জমা রাখেন, যেন প্রয়োজনে সেখান থেকে ঋণ নিতে পারেন। এর জন্য আছে সরকারি নীতিমালা। সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে মাঠপর্যায়ে জেলা ও উপজেলা সমবায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু নিবন্ধিত সমিতিগুলোকে তদারকির অভাব এবং ভূইফোঁড় সমিতিগুলোর কারণে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে।
বিশেষ করে পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী ও তাদের স্ত্রী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, গৃহকর্মী, দিনমজুর ও চাকরিজীবীরা উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে বিকল্প খাতে বিনিয়োগ করছেন। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সমবায় সমিতি এবং বিভিন্ন ছদ্মবেশী এমএলএম কোম্পানি এ সুযোগে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রথমদিকে অল্প অল্প করে মুনাফা ফেরত দিলেও নির্দিষ্ট সময় পর অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম গুটিয়ে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করছে। যারা সারা জীবন চাকরি করে পেনশনের টাকা জমা রেখেছিলেন, সেগুলো হারিয়ে শেষ বয়সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
এমএলএম ব্যবসার নামে এই প্রতারণা নতুন নয়। তবে যুবক ও ডেসটিনির কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগে এ নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য হয়নি। প্রথমে যুবক ও পরে ডেসটিনির প্রতারণা জানাজানি হলে সমাজে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও কিছুটা নড়েচড়ে বসে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ডেসটিনি ও যুবকসহ অন্যান্য এমএলএম প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রতারিত লাখ লাখ মানুষ অর্থ ফেরত পায়নি।
২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রণীত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের পাশাপাশি পিরামিড সদস্য বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্রতি অনযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও এত কোম্পানি কীভাবে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে এমএলএম নিবন্ধন নিতে হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ায় কড়াকড়ি আসে এমএলএম ব্যবসায়। আইন হওয়ার পর শুরু হয় প্রতারণার নতুন রূপ। কখনো ক্ষুদ্র ঋণ, কখনো কো-অপারেটিভ সোসাইটি বা কো-অপারেটিভ ব্যাংক, আবার কখনো মাল্টিপারপাস সোসাইটি নানা নামে শুরু হয় আর্থিক প্রতারণা, যা এখনো চলছে।
অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন সমবায় সমিতি গড়ে ওঠার পেছনে অবশ্যই জেলা ও উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের দায় আছে। সমিতির কার্যক্রমগুলো তদারকি করা, গ্রাহকদের সচেতন করার বিষয়েও তাদের অবহেলা স্পষ্ট। যেকোনো সমিতিকে নিবন্ধন দেয়ার বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করাও প্রয়োজন।
এমএলএম কোম্পানি ও সমিতিগুলোর প্রতারণার পেছনে একদিকে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও স্পষ্ট। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় জামালপুরে সমবায় সমিতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠছে এসব প্রতিষ্ঠান। বছরের পর বছর ধরে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী। দারিদ্র্য এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব সমবায় সমিতি গ্রাহকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
আল আকাবা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা না দিয়েই তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এরপর একে একে আরও ২২টি সমবায় সমিতির নাম সামনে আসে, যারা গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়েছে। এসব সমিতিতে বিনিয়োগ করেছিলেন ৫০ হাজারের বেশি গ্রাহক। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরই এসব সমবায় সমিতি গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থ ফেরত না দিয়েই নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সমবায় সমিতির কর্তাব্যক্তিরাও আত্মগোপনে চলে গেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি এবং সিআইডির অনুসন্ধান প্রমাণ করে, সমস্যাটি এখন কেবল একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং সারা দেশেই তা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই পরিচালিত হয় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে, অথচ তাদের কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর যথাযথ নজরদারি বা তদারকি নেই। আবার কিছু প্রতারক কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্স ছিল, কিন্তু তাদের কোনো গ্যারান্টর ছিল না। এ কারণে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার পর কাউকে ধরা যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে একাধিক দিক থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। প্রথমত, সমবায় সমিতি ও এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন ও কার্যক্রম পরিচালনায় কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে যাতে অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসে। তৃতীয়ত, অর্থ আত্মসাৎকারীদের দেশ ত্যাগ রোধে আগেভাগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়মিতভাবে নিরীক্ষা ও তদারকির আওতায় আনতে হবে।
ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের প্রতারণামূলক ব্যবসা খেলে বসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতারণার বিরুদ্ধে এখনই দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি হতে পারে আরও ভয়াবহ।



