গত ২৪ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় পে কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে পে কমিশনের প্রধান করা হয় এবং আগামী ৬ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী বেতন ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম পে কমিশন ২০২৫ গঠন করা হয়।
আমাদের নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের একটাই দাবি, আমরা ২০১৫ সালের মত বৈষম্যের বেতন কাঠামো চাই না। এই পে স্কেলে উপরের গ্রেডের কর্মচারীদের (প্রচলিত কর্মকর্তা) খুশি রেখে পে স্কেল পাশ করেছে। এই পে স্কেলে সর্বনিম্ন ২০ তম গ্রেডের একজন কর্মচারী ৮২০০ টাকা বেতন স্কেলে সর্ব সাকুল্যে ১৪ থেকে ১৫ টাকা বেতন পান। কিন্তু প্রথম গ্রেডের একজন কর্মচারী ৭৮০০০ টাকা স্কেলে সাকুল্যে বেতন সহ আনুষঙ্গিক প্রায় ২০০০০০ টাকার অধিক সুবিধা পান। আমি বলছিনা ২ জনের বেতন সমান হোক। ২ জনের গ্রেড অনুযায়ী পার্থক্য থাকা উচিত। কিন্তু পার্থক্যের লেভেল দেখে মনে হয়, নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য খাবার আলাদা। তাদের পরিবারের জন্য খাবার কিনতে হয় না! তারাও মানুষ, তাদের পেটেও ক্ষুধা আছে। তাদেরও সংসার চালাতে হয়। বৃদ্ধ মা-বাবা, ছোট ভাই-বোন, নিজের বউ-বাচ্চা সবার প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। এ বিষয়গুলো বেমালুম উপেক্ষা করা হয়েছে।
আমরা ২০১৫ সালের বেতন স্কেলটি একটু পর্যালোচনা করার জন্য উপস্থাপন করছি। গ্রেড ১- ৭৮০০০ টাকা, গ্রেড ২- ৬৬০০০ টাকা, গ্রেড ৩- ৫৬০০০ টাকা, গ্রেড ৪- ৫০০০০ টাকা, গ্রেড ৫- ৪৩০০০ টাকা, গ্রেড ৬- ৩৫৫০০ টাকা, গ্রেড ৭- ২৯০০০ টাকা, গ্রেড ৮- ২৩০০০ টাকা, গ্রেড ৯- ২২০০০ টাকা, গ্রেড ১০- ১৬০০০ টাকা, গ্রেড ১১- ১২৫০০ টাকা, গ্রেড ১২- ১১৩০০ টাকা, গ্রেড ১৩- ১১০০০ টাকা, গ্রেড ১৪- ১০,২০০ টাকা, গ্রেড ১৫- ৯৭০০ টাকা, গ্রেড ১৬- ৯৩০০ টাকা, গ্রেড ১৭- ৯৩০০ টাকা, গ্রেড ১৮- ৮৮০০ টাকা, গ্রেড ১৯- ৮৫০০ টাকা, গ্রেড ২০- ৮২০০ টাকা।
এবার দেখি পার্থক্যগুলো। গ্রেড ২০ থেকে ১৯ গ্রেডের পার্থক্য ২৫০ টাকা, গ্রেড ১৯ থেকে ১৮ তে ৩০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৮ থেকে ১৭ তে ২০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৭ থেকে ১৬ তে ৩০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৬ থেকে ১৫ তে ৪০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৫ থেকে ১৪ তে ৫০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৪ থেকে ১৩ তে ৮০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১৩ থেকে ১২ তে ৩০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১২ থেকে ১১ তে ১২০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১১ থেকে ১০ম গ্রেডে ৩৫০০ টাকা বেশি, গ্রেড ১০ থেকে ৯ -এ ৬০০০ টাকা বেশি, গ্রেড ৯ থেকে ৮ এ ১০০০ টাকা বেশি, গ্রেড ৮ থেলে ৭ -এ ৬০০০ টাকা বেশি, ৭ম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৬৫০০ টাকা বেশি, গ্রেড ৬ থেকে ৫ -এ ৭৫০০ টাকা বেশি, ৫ম থেকে ৪র্থ গ্রেডে ৭০০০ টাকা বেশি, ৪র্থ থেকে ৩য় গ্রেডে ৬৫০০ টাকা বেশি, ৩য় থেকে ২য় গ্রেডে ৯৫০০ টাকা, ২য় থেকে ১ম গ্রেডে ১২০০০ টাকা বেশি।
১৮তম থেকে ১৭ তম গ্রেডের পার্থক্য ২০০ টাকা। ১৩ তম গ্রেডের সাথে ১২ তম গ্রেডের পার্থক্য ৩০০ টাকা। অথচ ১ম গ্রেড থেকে ২য় গ্রেডের পার্থক্য ১২০০০ টাকা। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, ১০ম গ্রেডের সাথে ৯ম গ্রেডের পার্থক্য ৬০০০ টাকা। ৯ম থেকে ৮ম গ্রেডের পার্থক্য ১০০০ টাকা। আবার ৮ম থেকে ৭ম গ্রেডের পার্থক্য ৬০০০ টাকা। ৯ম এবং ৭ম গ্রেডে ভালো বেতন কাঠামো রাখা হলেও এই ২ গ্রেডের মাঝে ৮ম গ্রেড বৈষম্যের শিকার। কেননা, এই পদটা নন-ক্যাডার। ক্যাডার সিস্টেমে ৮ম গ্রেডে পদ নেই বললেই চলে। এটাই সমস্যা।
এখানে গ্রেড অনুযায়ী স্কেল বিভাজনের হার দেখলে মনে পড়ে ছোট্ট বেলার, ‘বানর আর ইঁদুরের বিস্কুট ভাগ’ এর গল্প। গল্পের বানর ভাগ করে আর খায়। খেতে খেতে যা অবশিষ্ট ছিল, তা ইঁদুরের মধ্যে ভাগ করে দেয়। তেমনি হলো ২০১৫ সালের পে স্কেল।
আমরা এমন বৈষম্য মূলক গ্রেডিং সিস্টেম বাতিল চাই। পদ সোপান অনুযায়ী বেতন পার্থক্য থাকবে। তবে সেটা হোক যৌক্তিক। সবারই পরিবার আছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান দরকার হয়। তাই আমরা বলি না, ২০তম গ্রেডের সাথে মিলিয়ে আপনারা কম বেতন নিন। বরং আমরা বলি আপনি উপরে বসে নিজের জন্য যেই বেতন নির্ধারণ করবেন, নিচের লোকদের কথা বিবেচনা করে সেই অনুপাতে সম আনুপাতিক হার বজায় রেখে পে স্কেল করুন।
সে ক্ষেত্রে গ্রেড সংখ্যা কমানো যেতে পারে। উপরে পদ অনুযায়ী গ্রেড যা আছে, তা বহাল রাখা যায়। সে ক্ষেত্রে ১১,১২,১৩ এই তিন গ্রেডের কর্মচারীদের কর্মপরিধি এবং যোগ্যতা প্রায় সমান। তাই এই ৩ টা গ্রেড মার্জ করে ১ টা গ্রেড করা যায়। ১৪ ও ১৫ মার্জ করে একটা গ্রেড, ১৬ ও ১৭ মার্জ করে একটা গ্রেড, ১৮ ও ১৯ ম্যারেজ করে একটা গ্রেড করা যায়। ২০ তম গ্রেড বহাল থাকবে। তাহলে মোট গ্রেড হবে ১৫ টি৷ এর বেশি বিভাজন দরকার নাই। কর্মচারীদের জন্য ৫টির বেশি বিভাজন প্রয়োজন নেই।
সেই ক্ষেত্রে ১৫ টি গ্রেড হলে, ১৫ তম গ্রেডে বেসিক ২০০০০ টাকা শুরু করে, প্রতিটি গ্রেডে পার্থক্য ৫০০০ টাকা করে রাখা যায়। তাতে ১ম গ্রেডে বেসিক হবে ৯০০০০ টাকা। আমার ব্যক্তিগত দাবি হল, আপনারা গ্রেড ২ এবং গ্রেড ১ এর মধ্যে যে পার্থক্য রাখবেন, সেই একই অনুপাতে পার্থক্য রাখতে হবে নিচের গ্রেড পর্যন্ত। এবং নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যাতে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। আশাবাদী সরকার আমাদের দাবি সমূহ বিবেচনায় রাখবেন।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।

আবদুর রহমান
গবেষক ও বিশ্লেষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।

