বাংলা একাডেমি জাতির মনন নিয়ে কাজ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যের নানামুখী উন্নয়ন ও গবেষণাই এর মূল কাজ। পাশাপাশি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্যে বাংলা সাহিত্যের সমান্তরালে অন্যান্য বিষয়ের (বিশেষ করে আইটি ও বিজ্ঞান) উপরও গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
এক কথায় বুদ্ধিজীবী বা বাংলা সাহিত্যের পান্ডিত্যের উপর ভিত্তি করে বাংলা একাডেমির কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে এবং চলমান। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এবং যুগের চাহিদার প্রেক্ষাপটে শুধু পান্ডিত্য নয়, সমসাময়িক বিষয়াদি ও প্রশাসনিক জ্ঞানের বিশাল চাহিদার প্রয়োজন হচ্ছে একই সাথে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের পালস বুঝে ধারাবাহিকভাবে ব্যক্তিত্ব ও সার্বিকজ্ঞানে গুনান্বিত ব্যক্তিবর্গকে এই একাডেমির মহাপরিচালক পদে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যতিক্রম হয়েছে জুলাই গণ আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে। স্বৈরাচারী সরকারের পতনে ছাত্র- যুব সমাজের বিরাট সাফল্যকে পুঁজি করে পরবর্তীতে সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহতে বয়স বা ব্যক্তিত্বপূর্ন সার্বিক জ্ঞানে গুনান্বিত ব্যক্তিবর্গকে হেয় করা হয়েছে।
একজন উপদেষ্টা রাস্তায় আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে সভা করে বিভিন্ন সংস্থা/দপ্তর/অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে আলোচনা করে দায়িত্ব প্রদান করেন। সেই সভায় বয়স, অভিজ্ঞতা বা বিভিন্ন গুনে গুনান্বিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ বা জ্ঞানী মানুষকে বিবেচনায় রাখা হয়নি। রাস্তায় আন্দোলনকারী যোদ্ধা আর মননশীল কাজে পারদর্শী কখনও এক পাল্লায় মাপা যায় না।
ফলশ্রুতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ও অ্যাকাডেমিক বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষ না থাকায় এখন সেসব প্রতিষ্ঠান অথর্ব ও স্থবির প্রতিষ্ঠানে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে। জাতি গঠনে অগ্রনী ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহতে (উদাহরনস্বরূপ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে) অপেক্ষাকৃত কম বয়সী, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকা ব্যক্তিবর্গকে শুধুমাত্র স্বীয় বিষয়ে পারদর্শী হওয়ায় আর গনআন্দোলনে ভূমিকা থাকার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।
যেমন বাংলা একাডেমিতে যাকে দেয়া হয়েছে তিনি স্বীয় বিষয়ে প্রচুর পান্ডিত্যের অধিকারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একেবারেই অনভিজ্ঞ-যিনি কখনই কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাজে জড়িত ছিলেন না। যার প্রমান তিনি গত বইমেলা, বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং বর্তমান কর্মকান্ডে প্রমান করে দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন।
মূলত : গনআন্দোলনের নেপথ্যে লুকায়িত প্রথমআলো পত্রিকা এবং চিন্তক ও লেখক ফরহাদ মাজহারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি এই পদে আসীন হয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা না থাকায় স্বৈরাচারী সরকারের একনিস্ট কর্মী ও সমর্থকদের মিথ্যা প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে তিনি আওয়ামী পল্টিবাজদের নিয়ে প্রশাসন গড়ে তুলেছেন। দায়িত্বশীল সব পদগুলোতে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের অধিকাংশই আওয়ামী দোসর- যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
উপর মহলের আশীর্বাদ পুষ্ট হওয়ায় ডিজিসহ পুরো একাডেমি এখন একটি অজানা সিন্ডিকেটে আটকা পড়ে গেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রকৃতি ও ভাবগাম্ভীর্য না বুঝায় কেউ কোন মত প্রকাশ করতে পারছে না এবং মুখ বন্ধ করে সব অবলোকন করছে। আর পল্টিবাজ আওয়ামীরা অনাড়ম্বর পরিবেশে তাদের পূর্বের চরিত্র প্রকাশ করে ক্ষমতার দাপট ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে।
এর সাথে যোগ দিয়েছে নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত বিএনপি ও জামায়াতের কিছু ক্ষমতালিপ্সু কর্মকর্তা/কর্মচারী। পল্টিবাজ আওয়ামীরা স্বীয় স্বার্থ চারিতার্থ করার অভিপ্রায়ে ডিজিকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। ব্যক্তিগত সুবিধা ও একাডেমিকে অথর্ব করার প্রয়াসে তারা সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে প্রথম থেকেই সোচ্চার। অথচ এই সংস্কার নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক কোন জ্ঞান নেই।
কি সংস্কার করবে এবং ফলাফল কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় আসবে সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণাও তাদের নাই। গত ০৭-০৭-২০২৫ তারিখে বাংলা একাডেমি সংস্কার নিয়ে যে কমিটি গঠিত হয়েছে তাদের সিংহভাগই ডিজির একান্ত সান্নিধ্যে থাকা প্রিয়জন- যাদের বাংলা একাডেমির মত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নাই।
এরা সারাটা জীবন বাংলা একাডেমির কঠোর সমালোচনা করেছেন নিজেদের স্বার্থে। এমনও ব্যক্তি এই কমিটিতে রয়েছেন যারা একাডেমির ভিশন ও মিশনই বলতে পারবেন না। আবার অনেকে এই আন্দোলনের পূর্বে কখনই একাডেমিতে প্রবেশ করেননি। এদের অধিকাংশই মূলত প্রথমআলো পত্রিকার আশীর্বাদপুষ্ঠ যা নামগুলো দেখলেই বোঝা যাবে।
যাদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে তাঁদের একাডেমি বিষয়ে প্রভূত এবং প্রাথমিক জ্ঞান নেই; আছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্য বিষয়ে শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা- যা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ঘাটলেই বোঝা যাবে। আবার অনেকেই শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যায় পারদর্শী। সংস্কার করতে হলে কোন কোন সেক্টরের প্রতিনিধি লাগবে- তা এই কমিটিতে প্রতিভাত হয়নি।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক পছন্দই এর মূল সহায়ক। যিনি সভাপতি, তিনি মূলত একজন আমলা। জাদুঘর বিষয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর তবে বাংলা একাডেমির বিষয়ে তিনি কতটুকু অবহিত সকলের কাছে তা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবিকপক্ষে একাডেমির সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সংস্কার নয়; প্রয়োজন সরকারের সুদৃষ্টি, ইনোভেটিভ আইডিয়া আর বর্তমান কর্মপ্রক্রিয়ায় আধুনিকতা সৃষ্টি। প্রকৃত ফলাফল পেতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে:
১. অধ্যাপক আনিসুজ্জামান/অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের মত পন্ডিত ব্যক্তিদের ন্যায় বর্তমানে জীবিত যোগ্য প্রতিনিধি।
২. একাডেমির ফেলো/জীবন সদস্য/সদস্যদের প্রতিনিধি হিসেবে একজন ফেলো প্রতিনিধি।
৩. প্রাক্তন মহাপরিচালকদের মাঝ থেকে প্রতিনিধি।
৪. প্রাক্তন সচিবদের মাঝ থেকে প্রতিনিধি।
৫. প্রাক্তন গুনী ও জ্ঞানী পরিচালকদের মাঝ থেকে প্রতিনিধি।
৬. আইনকানুন সম্পর্কে জ্ঞাত এমন প্রতিনিধি।
৭. সাবেক আমলা (যিনি প্রশাসনিক ও একাডেমিক জ্ঞানে গুনান্বিত) প্রতিনিধি।
৮. সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব: ২জন প্রতিনিধি।
৯. স্বনামধন্য লেখক, কবি, সাংবাদিক: ২জন প্রতিনিধি।
১০. কপিরাইট বিভাগের প্রতিনিধি ১জন
১১. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসিদের মাঝ থেকে প্রতিনিধি।
১২. বাংলা একাডেমি নির্বাহী পরিষদের প্রতিনিধি ১জন।
১৩. বাংলা একাডেমির বর্তমান পরিচালকবৃন্দ থেকে প্রতিনিধি ২জন।
১৪. সদস্য সচিবের দায়িত্বে থাকবেন বাংলা একাডেমির সচিব।
ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত কমিটি ও কমিটির কার্যপরিধি দেখে সর্বস্তরের লেখক, পাঠক ও গুনীজন গভীর উষ্মা প্রকাশ করেছেন।তারা সংস্কারের নামে ব্যক্তি পর্যায়ের সুবিধা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

লেখক: সম্পাদক, জুলাই রক্তাক্ত দলিল
সাংস্কৃতিক কমী ও সংগঠক

