খসরু খান
সমুদ্র যতটা নীল, তার গভীরতা ততটাই রহস্যময়। চোখের সামনে শান্ত, অথচ অন্তরে লুকিয়ে এক অদৃশ্য আন্দোলন। আমরা যারা দীর্ঘদিন সমুদ্র পাড়ি দিয়েছি, তারা জানি—ঝড় আসার আগে শুধু আকাশ নয়, গরম হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ। সমুদ্র, বাতাস, এমনকি নাবিকদের শরীরও টের পায়—কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। হঠাৎ করে বাতাস বন্ধ হয়ে আসে, গর্জন ছাড়াই আকাশ কালো হয়ে ওঠে, আর নৌকা-জাহাজের সব যন্ত্রপাতি যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে—ঝড় কবে আঘাত হানে।
রাজনীতি ঠিক সেরকমই—সমুদ্রের মতো গভীর, অদ্ভুত এক ছায়াজগৎ। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে জমে থাকা উত্তাপ কখন ফেটে পড়বে, কেউ জানে না। এমনকি যারা তাসের ঘরে রাজ্যের খেলা চালায়, তারাও সবসময় আন্দাজ করতে পারে না—কখন কোথা থেকে বিদ্রোহ উঠবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন চারপাশ স্বাভাবিক ছিল, পত্রিকার হেডলাইন ছিল শান্তিপূর্ণ, অথচ কয়েক দিনের ব্যবধানে বদলে গেছে দেশের পুরো দৃশ্যপট। ’৯০ সালে এরশাদ পতনের আগেও মানুষ মিছিল করছিল, কিন্তু সরকার ছিল আত্মবিশ্বাসী। ’৭১ সালে পাকিস্তানিরা বিশ্বাসই করতে পারেনি, এদেশের সাধারণ মানুষ হঠাৎ এমন দুর্ভেদ্য হয়ে উঠবে। আবার ২০০৬-২০০৮-এর সময়ও রাজনৈতিক দলগুলো ভাবছিল তারা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, কিন্তু রাস্তায় জমে থাকা জনঅসন্তোষ এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি—এই তিনটি স্তম্ভ একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে বাঁধা, যেখানে একটির কম্পন অন্য দুইটিকেও কাঁপিয়ে দেয়। বর্তমান সময়েও আমরা দেখছি—একদিকে বৈশ্বিক মন্দা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জড়তা; সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুমোট গরম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারছেন না। কেউ কেউ বুঝেও চুপ। আবার কেউ কেউ জেনেও ভাবছেন—এটা শুধু সাময়িক, ঝড় আসবে না।
কিন্তু অভিজ্ঞ নাবিক জানে, যখন খুব গরম পড়ে, আর বাতাস থেমে যায়—তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর ঝড় আসে।
আজ রাজনৈতিক মঞ্চে যে নীরবতা, তা কি নিছকই স্বাভাবিক? জনগণ কি সত্যিই নিষ্ক্রিয়, না তারা কোনো অদৃশ্য সংকেতের অপেক্ষায় আছে? ইতিহাস বলে—এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণের বীজ।
বিএনপি একসময় ভেবেছিল তারা চিরকাল থাকবে, কিন্তু আন্দোলনের আগুনে তাদের গদি উড়ে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগও একসময় পরিবর্তনের ঢেউয়ে এসে ক্ষমতায় বসেছিল, আজ তারাও বুঝছে—যে ঢেউয়ে ভেসে এসেছিল, সেই ঢেউ একদিন আবার তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এটা তারা চিন্তাও করেনি, সমুদ্র যেমন কারও নিজস্ব নয়, রাজনীতিও তেমন নয় কোনো দলের উত্তরাধিকার।
সমাজের মানুষের মনে এখন অসন্তোষ আছে, বেকারত্ব আছে, আছে মূল্যস্ফীতি আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। শিক্ষিত যুবসমাজ হতাশ, মধ্যবিত্ত চুপ করে আছে, শ্রমিক শ্রেণি ঘাম ঝরাচ্ছে—কিন্তু হাসছে না। এ হাসিহীন সমাজই একদিন জেগে ওঠে—ঝড় হয়ে।
এই যে একটানা গরম পড়ছে রাজনীতির আকাশে, জনগণকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নীরব চাপ—এটাই কী সেই পূর্বাভাস নয়, যা ইতিহাস বারবার আমাদের দেখিয়েছে?
জানি না ঝড় কবে আসবে, কিন্তু এই নিশ্চুপ গরম, এই গুমোট পরিস্থিতি, এই থমকে থাকা বাতাস—সবই যেন বলে দিচ্ছে, সময় ফুরিয়ে আসছে। কারণ, ঝড় আসার আগে সব সময় আকাশ নীল থাকে না, কিন্তু বাতাস গরম হয়ে ওঠে—খুব গরম। এবং সেই গরমটাই সব বদলে দেয়।


