আশাবাদী ব্যক্তিরা কেবল ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী নন—তাঁদের মস্তিষ্কেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনার ধরণ প্রায় একরকম। জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য, যা সামাজিক সংযোগ ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভবিষ্যৎ কল্পনার সময় আশাবাদী ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে যে নিউরাল প্যাটার্ন তৈরি হয়, তা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। বিপরীতে, হতাশাবাদীদের চিন্তার ধরন ছিল বিচিত্র ও ভিন্নমুখী। গবেষকরা বলছেন, এই স্নায়ুবৈজ্ঞানিক মিলই হতে পারে আশাবাদীদের মধ্যে সহজ সামাজিক সংযোগের ব্যাখ্যা।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন মনোবিজ্ঞানী কুনিআকি ইয়ানাগিসাওয়া, যিনি বলেন, “এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল যে ‘একই রকমভাবে ভাবা’—এই বিমূর্ত ধারণাটি মস্তিষ্কে সত্যিকার অর্থে দৃশ্যমান হয়।” তিনি আরও বলেন, “এই প্রশ্নটি এতদিন বিজ্ঞানীদের স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়নি, কারণ এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের মধ্যবর্তী একটি ঘরানায় পড়ে।”
গবেষণায় অংশ নেন ৮৭ জন স্বেচ্ছাসেবী, যাঁরা আশাবাদী থেকে হতাশাবাদী—বিভিন্ন মানসিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রত্যেককে বলা হয়, ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন বিভিন্ন ঘটনা কল্পনা করতে। সেই মুহূর্তে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয় ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) প্রযুক্তির মাধ্যমে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, আশাবাদী ব্যক্তিরা ভবিষ্যতের ভালো এবং খারাপ ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখেন। তাদের মস্তিষ্ক ভালো ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, আর খারাপ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় অনেকটাই দূরবর্তী ও বিমূর্ত। এর ফলে নেতিবাচক চিন্তা তাদের ওপর কম আবেগগত প্রভাব ফেলে।
গবেষকেরা জানান, আশাবাদীদের মধ্যে এই মিল কেবল আচরণগত নয়, বরং তা স্নায়ুবৈজ্ঞানিকভাবেও বাস্তব। অর্থাৎ তারা এক ধরনের “ভবিষ্যৎ বাস্তবতা” ভাগাভাগি করেন। অন্যদিকে, হতাশাবাদীদের মস্তিষ্ক একেকজনের একেকভাবে ভবিষ্যৎ কল্পনা করে।
গবেষণার সারমর্ম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইয়ানাগিসাওয়া বলেন, “আমরা প্রায়ই বলি ‘একই তরঙ্গে আছি’। এটি আর শুধু একটি রূপক বাক্য নয়—এটি মস্তিষ্কেও প্রতিফলিত হয়। আশাবাদীদের মধ্যে সত্যিই একধরনের ভাগাভাগিকৃত মানসিক বাস্তবতা কাজ করে।”
তবে এই মানসিক সমতা জন্মসূত্রে আসে নাকি অভিজ্ঞতা ও সংলাপের মাধ্যমে তৈরি হয়—এ প্রশ্ন এখনো গবেষণার বিষয়। ইয়ানাগিসাওয়া বলেন, “আমার লক্ষ্য হলো একাকিত্বের উৎস বোঝা এবং মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, তার গভীরতর ব্যাখ্যা খোঁজা। এই গবেষণা সেই পথে এক ধাপ অগ্রসর।”
গবেষণাপত্রটি ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে কোবে বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, ওসাকার কমপ্রিহেনসিভ চিলড্রেন এডুকেশন ইউনিভার্সিটি, কিন্ডাই বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।

