জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির ভিত্তিতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে বিএনপির মতো কয়েকটি দল এসব সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের সংলাপের শেষ দিনে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হওয়ায় সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বাছাই কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও ভিন্নমত
ঐকমত্য কমিশন রাষ্ট্রের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং ন্যায়পাল। তবে, বিএনপিসহ পাঁচটি দল এই সিদ্ধান্তে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত জানাবে বলে জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এসব নিয়োগের জন্য শক্তিশালী আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং সংবিধানে নিয়োগ কমিটির বিধান যুক্ত করার বিরোধিতা করেছেন। কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, বিএনপি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, ১২ দলীয় জোট, এনডিএম ও আমজনতার দল এই বিষয়গুলোতে নোট অব ডিসেন্ট দেবে।
উচ্চকক্ষের গঠন ও ক্ষমতা
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে। উচ্চকক্ষের প্রার্থী ঘোষণার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নারী রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতা সম্পর্কে প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, এটির আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না। তবে অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিল উভয় কক্ষে উপস্থাপন করা হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না; এক মাসের বেশি বিল আটকে রাখলে সেটিকে উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে গণ্য করা হবে। নিম্নকক্ষ কর্তৃক প্রস্তাবিত বিলসমূহ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করবে উচ্চকক্ষ এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তা অনুমোদন অথবা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যদি উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করে, তবে উভয় কক্ষে পাস হওয়া বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে। সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে।
সংলাপে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সিংহভাগ দল একমত হলেও, এই কক্ষের সদস্যদের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় জটিলতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিএনপি, লেবার পার্টি, এনডিএম, ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী জোটের প্রতিনিধিরা জানিয়ে দেন যে তারা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ চান না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “পিআর পদ্ধতি হলে উচ্চকক্ষ চাই না।” তিনি বিষয়টি জাতীয় সনদে উল্লেখ করার অনুরোধ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা চাই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক হারে। বর্তমান সংরক্ষিত নারী আসন যেভাবে হয় সেভাবে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং আমজনতার দল। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সংলাপে অংশ নেওয়া অন্য দলগুলো কমিশনের প্রস্তাবে একমত বলে জানিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দল থেকে) এবং সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।
বাছাই কমিটির কাছে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে পাঁচজন করে ১০ জন এবং তৃতীয় বৃহত্তম দল দুজন করে নাম প্রস্তাব করবে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে বা ৪-১ ভোটে প্রধান উপদেষ্টার নাম রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব করবে। এ কমিটি ব্যর্থ হলে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতিকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তারা র্যাকড চয়েজ পদ্ধতিতে ১২ জনের মধ্য থেকে একজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে তাতেও ব্যর্থ হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুসরণ করা হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবেন না। তবে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটিতে বিচারপতিদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং র্যাকড চয়েজ পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে বিএনপি।
এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে আইনসভার উভয় কক্ষের (জাতীয় সংসদ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
ঐকমত্য কমিশন ঘোষণা করেছে যে সব রাজনৈতিক দল নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি দিতে একমত হয়েছে। তবে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধানের বিস্তারিত আলোচনায় দলগুলো একমত হয়নি। ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, এই সিদ্ধান্তকে প্রস্তাবনা হিসেবে পরবর্তী সংসদের জন্য সনদে যুক্ত করা হবে।
কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি উল্লেখ থাকবে। তবে নির্বাচনের পরে সংসদ চাইলে বিদ্যমান মূলনীতির স্থলে এগুলো যুক্ত করতে পারবে। আবার কেউ চাইলে বিদ্যমান মূলনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। তবে এই আলোচনা থেকে ওয়াকআউট করে সিপিবি, বাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ।
অন্যান্য নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত
কমিশন সিদ্ধান্ত দেয় যে, কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়া রাষ্ট্রপতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য; তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন। শেষ দুটোর বিষয়ে আপত্তি জানাবে বিএনপি, এলডিপি, লেবার পার্টি, এনডিএম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট। গভর্নর নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে নাগরিক ঐক্যের।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ উল্লেখ করেছেন যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রধান এবং মৌলিক দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। তিনি বলেছেন, পরবর্তীতে প্রয়োজনবোধে এই বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্য কমিশন সবাইকে নিয়ে প্রয়োজনে বসবে।
দ্বিতীয় ধাপের সংলাপে মোট ১৯টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ৯টার পর আলী রীয়াজ দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের সমাপ্তি টানেন। সংলাপ শেষে দলগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেয় এবং নেতারা পারস্পরিক শুভকামনা ব্যক্ত করেন।

