ভ্রমণ মানে শুধু পথ চলা নয়, ভ্রমণ মানে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা। ভিন্ন শহর মানেই নতুন রঙ, নতুন গন্ধ, নতুন জীবনধারা। আমার এবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল আমেরিকা থেকে, সীমান্ত পেরিয়ে কানাডার টরেন্টো হয়ে, সেখান থেকে নায়াগ্রা জলপ্রপাত, তারপর নিউ ইয়র্ক প্রদেশের রাজধানী আলবেনি হয়ে, অবশেষে পৌঁছালাম পৃথিবীর আলো ঝলমলে শহর নিউ ইয়র্ক সিটিতে।
প্রথমেই টরেন্টো। আধুনিকতা আর বৈচিত্র্যের শহর। এর ডাউনটাউন অংশে হাঁটলেই বোঝা যায় কেন একে বহুজাতিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন বলা হয়। নানা দেশের মানুষ এখানে এসে মিশে গেছে এক সুতোয়। সিএন টাওয়ারে দাঁড়িয়ে যখন গোটা শহর চোখের সামনে এলো, মনে হলো শহরটা যেন আকাশের সাথে কথা বলছে। লেক অন্টারিওর শান্ত জলরাশি, পার্ক, সুউচ্চ অট্টালিকা সব মিলিয়ে টরেন্টো যেন আধুনিকতার সাথে প্রকৃতির সহাবস্থানের প্রতীক।
এরপর টরেন্টো থেকে যাত্রা করলাম নায়াগ্রা জলপ্রপাতের দিকে। ডাউনটাউন থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বিশ মিনিট পথ পাড়ি দিয়ে বিকেলের দিকে সেখানে পৌঁছালাম। জলপ্রপাত তখন বিকেলের আলোয় এক অনন্য সৌন্দর্যে ভেসে উঠেছে। গর্জন ধ্বনি যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে, পানির ধারা আকাশ ছুঁয়ে নিচে নেমে আসছে, চারদিকে ছিটকে পড়া ফোঁটাগুলো মুখে এসে পড়ছিল। সূর্যের তির্যক আলোয় যখন জলপ্রপাতের ওপরে রঙধনু ভেসে উঠল, মনে হলো আমি যেন স্বপ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি।
জলপ্রপাতের এত কাছে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো এই জলপ্রপাতের সৃষ্টির রহস্য কী? হাজার বছরের প্রাকৃতিক শক্তি, বরফ গলা নদীর ধারা আর সময়ের দীর্ঘ ইতিহাস মিলিয়েই তো সৃষ্টি হয়েছে এই অনন্য বিস্ময়। তখন মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির হাতে যেন লুকানো আছে এক মহাগ্রন্থ, যার একটি অধ্যায় আমি সেদিন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম।
নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে ফিরে এলাম নিউ ইয়র্ক প্রদেশের রাজধানী আলবেনিতে। পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থিত এই শান্ত শহরটি যেন ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে। আমি এখানে টানা ২২ দিন অবস্থান করি। নিউ ইয়র্ক প্রদেশের যাবতীয় সরকারি কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হয়। রাজ্য ক্যাপিটল ভবন, অ্যাসেম্বলি হল, প্রশাসনিক দপ্তর—সব মিলিয়ে আলবেনি হলো প্রদেশের কেন্দ্রবিন্দু। দিনের বেলা প্রশাসনিক ব্যস্ততা, আর সন্ধ্যায় ছোট শহরের নিরিবিলি জীবন আমাকে নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য আর প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন শান্তির পাঠ শিখিয়েছে।
দীর্ঘ ২২ দিনের আলবেনি অবস্থানের পর অবশেষে যাত্রা শুরু করলাম নিউ ইয়র্ক সিটির পথে। তবে সরাসরি ম্যানহাটনে যাইনি। সময় মতো রাত নামতেই সেখানে পৌঁছালাম। শহরে প্রবেশ করলাম রাত ১১টার দিকে, আর সেখান থেকে ম্যানহাটনের পথে চললাম। ব্যস্ত নগরী রাতেও ঘুমোয় না, বরং রাতের আলোয় যেন আরও জেগে ওঠে। আমি সেখানে অবস্থান করলাম ভোর ৩টা পর্যন্ত।
ম্যানহাটনে পৌঁছেই প্রথম যে বিস্ময় আমাকে আচ্ছন্ন করল, তা হলো আকাশচুম্বী অট্টালিকা। এত উঁচু উঁচু ভবন দাঁড়িয়ে আছে যে, ভালোভাবে দেখতে গেলে সত্যিই ঘাড় ব্যথা করে যায়। ১০০ কিংবা ১২০ তলার ভবনগুলো যেন শহরের বুক চিরে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াল স্ট্রিট, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, সেন্ট্রাল পার্ক, প্রতিটি জায়গা-ই একেকটা জীবন্ত ইতিহাস। টাইমস স্কোয়ারে রাতের আলো ঝলমলে পরিবেশে মনে হলো পৃথিবী যেন এখানে এসে থেমে আছে। হাজারো মানুষের ভিড়, রঙিন বিজ্ঞাপনের আলো, রাস্তার শিল্পীদের গান ও নাচ, সবকিছু মিলে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
মানুষ বলে “নিউ ইয়র্ক সিটি কখনো ঘুমায় না”, সত্যিই তাই। রাত গভীর হলেও শহর তখনও জেগে আছে, তখনও চলছে জীবন, তখনও মানুষ খুঁজছে আনন্দ আর স্বপ্ন।
এই ভ্রমণ শেষে আমার মনে হলো, আমি শুধু স্থান দেখিনি, নতুন শিক্ষা অর্জন করেছি। টরেন্টো আমাকে দিয়েছে শান্তির বার্তা, নায়াগ্রা জলপ্রপাত শিখিয়েছে প্রকৃতির শক্তির সামনে বিনয়ী হতে, আলবেনি শিখিয়েছে প্রশাসন আর ইতিহাসের মর্যাদা, আর নিউ ইয়র্ক সিটি, বিশেষ করে ম্যানহাটন আমাকে দিয়েছে সাহস, স্বপ্ন আর অদম্য প্রাণশক্তি। আমার দেখা গুলো তাই শুধু আমার ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখলাম না, সবার সাথে ভাগ করে নিতে লিখে ফেললাম এই ভ্রমণকাহিনি।

খসরু খান
লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

