আজাহার আলী সরকার
৫ আগষ্ট ২০২৪ এ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে রাষ্ট পরিচালনায় সংকট তৈরি হলে, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি গত ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাইলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের সাত বিচারপতি ‘স্পেশাল রেফারেন্স নং-১\২০২৪’-এ তাদের নিম্নরূপ মতামত দেন।
‘দেশের বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিগত ৬ আগস্ট-২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়েছেন, সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান-এর অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩) অনুসারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করা সম্ভবপর নয়।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ হতে গত ৮/৮/২০২৪ তারিখের ১০,০০,০০০০.১২৭.৯৯.০০৭.২০.৪৭৫ নং স্মারকে প্রেরিত পত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য শোনা হলো।
এমতাবস্থায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো বিধান না থাকায় উল্লিখিত প্রশ্নের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই মতামত প্রদান করছে যে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরী প্রয়োজনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি উক্তরূপে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাগণকে শপথ পাঠ করাতে পারবেন।’
উপরের মতামত বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায়, তা হল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের মতামত চাওয়ার প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ মতামত দেন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো বিধান না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো বিধান না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব নয়।
তাই আপিল বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের নেতৃত্বে কোন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়নি, করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা; যাকে প্রকারন্তে সংকটকালীন রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হিসেবে অভিহিত করা যায়। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় যেমন প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদ থাকে তেমনি জরুরী প্রয়োজনে রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্তে এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাকে সহযোগিতা করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি। তাই বর্তমান সরকারের প্রধান হিসেবে মোহাম্মদ ইউনূসকে বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ নেই।
প্রকৃতপক্ষে প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা পরিষদ রাষ্ট্রপতিকে সহযোগিতা করার জন্য এই জরুরি মুহূর্তে শুধু রাষ্ট্রের দৈনন্দিন নির্বাহী কার্য পরিচালনা করবেন। স্পষ্টতই বর্তমানে বাংলাদেশের এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্বে আছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা নন। তাই উপদেষ্টা পরিষদের সভাও হতে হবে রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল সমূহ নির্বাচনের রোডম্যাপ এবং অন্যান্য দাবি রাষ্ট্রপতির কাছে জানানো উচিত। তবে রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছায় নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পরিষদকে দিতে পারেন।
উল্লেখ্য আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতাম মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে কিন্তু “অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ” একটি খবরে আপিল বিভাগের মতামত পড়ার পরে জানতে পারলাম, আপিল বিভাগ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো বিধান না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, যা শুধুমাত্র রাষ্ট্রের দৈনন্দিন নির্বাহী কার্য পরিচালনা করার জন্য। আপিল মতামতের প্রেক্ষিতে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্রপতি যেমন প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন, তেমনি তিনি পূনর্গঠনের ক্ষমতাও সংরক্ষণ করেন।
রাষ্ট্রপতি উপদেষ্টা পরিষদের কর্ম পরিসর নির্ধারণ করেছেন কিনা তা জানা এবং রাষ্ট্রের দৈনন্দিন নির্বাহী কার্য পরিচালনার ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টাদের কোন পদমর্যাদা নির্ধারিত হয়েছে কি? যদি আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাহলে আগের বিধান অনুসারে ১০ জনের বেশি উপদেষ্টা নিয়োগের সুযোগ নেই। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকবে। সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রপতির কাছে রিপোর্ট করবে, প্রধান উপদেষ্টার কাছে নয়। এ বিষয়গুলোও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ফোরাম
লেখক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ফোরাম

