বাঙালির চরিত্রে জেদ এক অদ্ভুত শক্তি। এই জাতি কখনো হার মেনে নেয় না, কখনো চুপচাপ মেনে নেয় না অন্যের আধিপত্য, অপমান বা অগ্রাহ্য করা। ইতিহাসে ফিরে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। একদিন পাকিস্তানের সঙ্গে রক্তাক্ত সংগ্রাম করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল যারা, তারা হারের গ্লাস মুখে তোলে না সহজে। এমনকি খেলাধুলার মাঠেও, বিশেষ করে ক্রিকেটে। আমরা যারা মাঠে থাকি না, তারা মাঠের বাইরেও যেন যোদ্ধা হয়ে উঠি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘হার না মানা মনোভাব’ কি সবসময় ইতিবাচক?
প্রতিযোগিতার জগতে জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু বাঙালি সমাজে পরাজয়কে আমরা যতটা না স্বাভাবিকভাবে দেখি, তারচেয়েও বেশি দেখি অপমান, লজ্জা, ব্যর্থতা হিসেবে। আমরা হয় জিতে উল্লাস করি, নয়তো হেরে প্রতিশোধে ফেটে পড়ি। মাঝখানে একটা শব্দের অভাব, ‘শান্তি’। এই শান্তির অভাবেই গড়ে ওঠে আত্মতুষ্টি, অবিশ্বাস, এবং কখনো কখনো হিংসা। খেলায় হারলে গালি, রাজনীতিতে হারলে ষড়যন্ত্র, পরীক্ষায় খারাপ করলে আত্মহত্যা; এটাই কি একুশ শতকের বাস্তবতা হবে?
আমাদের ঘরের ছেলেটি যদি হেরে আসে, আমরা বলি “কি করলি তুই? এত খাটাখাটনি করে এটাই ফল?” অথচ হয়তো সে প্রাণ দিয়ে লড়েছে, তার প্রতিপক্ষ ছিল অনেক শক্তিশালী। আমরা বুঝি না, পরাজয়ও একটা শিক্ষা। এই শিক্ষা নিয়েই যে জাতিগুলো ভবিষ্যতের পথ রচনা করে, তারা হয় পরিণত। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত ব্যর্থতাকে অপমান মনে করে বসে থাকি।
সদ্য শেষ হলো পাকিস্তানের সাথে ৩ টি টি-২০ ম্যাচের শেষ খেলা। এখানে বাংলাদেশ ৭৪ রানে হেরেছে, কিন্তু আগের ২টি খেলা জয় পেয়ে সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা সাধারণ কথাবার্তায় আমরা যেন কেবল আজকের হারটাই দেখছি। বাঙালির এই মানসিকতা অনেকটা এমন, একজন পাগলের সাথে যত কথাই হোক, শেষে যদি একটা চড় দেওয়া হয়, পাগল কিন্তু কিছু মনে রাখবে না, শুধু সেই চড়টাই মনে থাকবে। আমাদের মন-মানসিকতাও ঠিক তেমন। আগের জয় ভুলে গিয়ে শেষের হারটাই মনে রাখি, এবং তাতেই আমাদের আবেগ ফেটে পড়ে।
একটা সময় ছিল, যখন স্কুলে শিশুদের শেখানো হতো—’হার জিতের খেলায় জিতলে ভালো, হারলেও দুঃখ নাই’। আজ সেই বাক্য শুধু দেয়ালে ঝুলে আছে, মননে আর নেই। আমরা শুধু জিততে চাই, তা সে যেকোনো উপায়ে হোক। হোক তা রাজনীতির মাঠে, হোক খেলার মাঠে, বা হোক জীবনের প্রতিযোগিতায়। এই মনোভাব থেকে জন্ম নেয় অসহিষ্ণুতা। একটি দল হারলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় ওঠে; গালি, বিদ্বেষ, অপমানের পাহাড় বানিয়ে ফেলি। আমরা ভুলে যাই, খেলার মূল শিক্ষা কখনো জয় নয় সততা, সংযম, এবং দলগত সংহতি।
এই মনোভাব শুধু খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চেয়েও বড় আকারে দেখা যায় জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়। আমার জানামতে বাংলাদেশে এমন কোনো নির্বাচন নেই, যেটা নিয়ে বিতর্ক হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল নিজের বিপক্ষে দেখলেই শুরু হয় বিশেষ সুর; এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, কারচুপি হয়েছে, এ ফল আমরা মানি না। প্রতিবারই যেন একই নাটক: ভোটের আগে উত্তেজনা, ভোটের দিন আশাবাদ, আর ভোটের পর অস্বীকৃতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পার করেও মানুষ এখনো দেখতে পায়নি একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন, যেখানে জয়ী দল যেমন উৎসবে মাতবে, পরাজিত পক্ষও গর্ব নিয়ে বলবে—”আমরা হেরেছি, তবে এই নির্বাচন ছিল নিরপেক্ষ”।
আমরা যেন এখনো নির্বাচনকে গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ না ভেবে ‘ক্ষমতায় যাওয়ার খেলা’ হিসেবে দেখি। এই খেলা এমনই, যেখানে হারা মানেই শূন্য, আর জেতা মানেই সর্বেসর্বা। ফলে কেউই হার মানতে চায় না, মেনে নিতেও পারে না। অথচ গণতন্ত্র শেখায় পরাজয় কোনো অপমান নয়, বরং তা ভবিষ্যতের প্রস্তুতির একটি ধাপ।
বাঙালির আবেগের গভীরতা অসাধারণ। সেই আবেগে একদিন আমরা যুদ্ধ করেছি, গণঅভ্যুত্থান করেছি, ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। কিন্তু সেই একই আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে, তখন সেটা হয়ে যায় ধ্বংসাত্মক। আজ আমাদের প্রয়োজন সেই আবেগকে সংযমে রূপান্তর করার। জয়কে যেমন আমরা উদযাপন করি, তেমনি হারের মাঝে লুকিয়ে থাকা শিক্ষা, শক্তি, ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও আলিঙ্গন করতে হবে।
হার মানা মানে হেরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো হার মানাই এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব বলে, যে খেলোয়াড় হারকে বিশ্লেষণ করতে পারে, সে-ই একদিন জিততে শেখে। জাতির ক্ষেত্রেও তাই। আত্মবিশ্লেষণ, ধৈর্য, ও আত্মসমালোচনার চর্চা না থাকলে কোনো জাতিই টেকসই উন্নতির পথে এগোতে পারে না। আমরা বাঙালিরা যদি শিখে নিতে পারি হার মানার সাহস, মেনে নেওয়ার মানসিকতা—তাহলেই আমরা শুধু জাতি হিসেবে জিতবো না, মানুষ হিসেবেও বড় হয়ে উঠবো।


