আতাউর রহমান বাবুল
আমি অনেক দিন ধরেই একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবছি এবং মানুষের কাছে জানতে চাচ্ছি—আসলে কেউ কি আছেন, যিনি একটু সময় নিয়ে আমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন?
আমরা যারা আজ আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপে বসবাস করছি, তারা সবাই এমন রাষ্ট্রে রয়েছি, যেগুলো সেক্যুলার এবং বহুত্ববাদী ব্যবস্থার অনুসারী। অর্থাৎ, এই দেশগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না—বরং সব ধর্ম, সংস্কৃতি, মত ও বিশ্বাসকে সমান মর্যাদায় গ্রহণ করে। আমি নিজে একজন মুসলমান হিসেবে এখানে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আমার ধর্মীয় চর্চা করি—কোনো হস্তক্ষেপ নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো বাধা নেই।
কিন্তু শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতাই নয়—এই সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলো নাগরিক হিসেবে আমাদের এমন অনেক অধিকার ও সুযোগ দিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের নিজ জন্মভূমিতে আমরা পাইনি। আমার পরিবার নিরাপদ, সন্তানেরা সম্মানজনক শিক্ষা পাচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, এবং আমরা আমাদের আত্মীয়স্বজনকেও এখানে আনার চেষ্টা করছি—অনেকেই ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছেনও।
অর্থাৎ, এই ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলোই আজ আমাদের পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিয়েছে। আমি একে আল্লাহর এক বড় নিয়ামত হিসেবে দেখি।
তবে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব আমাকে নাড়া দেয়।
দেখি, আমাদেরই অনেকে—যারা এই সেক্যুলার সমাজের সব সুবিধা গ্রহণ করছেন—তারাই আবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। তারা চান না বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকুক। প্রশ্ন জাগে—এটা কি দ্বিচারিতা নয়? এটা কি অকৃতজ্ঞতা নয়?
আমরা যখন দেখি, কেউ আমেরিকা বা ফ্রান্সে বসে ইউটিউবে সেক্যুলারিজম-বিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন—অথচ সেক্যুলারিজমই তো তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর নিয়ামত! তাঁরাই তো সেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং মর্যাদার সব সুবিধা ভোগ করছেন।
একটি প্রশ্ন আমি সবার কাছে রাখি—আমরা মুসলমান হয়েও কেন ইসলামি রাষ্ট্রগুলোকে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করছি না? কেন আমরা ইহুদি-খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোকেই বেছে নিয়েছি?
সত্যি বলতে, উত্তরটা আমাদের আচরণের মধ্যেই নিহিত। কারণ, এই দেশগুলোর ভিত্তি হলো—ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ। এটাই সেক্যুলারিজম। এবং এটাই আমাদের জীবনে শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ভিত্তি।
তাই আমি বলি—যে ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের এখানে এই শান্তিপূর্ণ জীবন দিয়েছে, সেই একই নীতি যদি বাংলাদেশেও বাস্তবায়িত হয়, তবে আমরা কেন তাকে সমর্থন করব না?
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্ম, সব মতের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে। যেখানে রাষ্ট্রের কাছে সবাই সমান, ধর্ম কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র নয় বরং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে।
আমাদের সন্তানেরা যেন একদিন গর্ব করে বলতে পারে— “আমার মাতৃভূমিও এক উদার, মানবিক ও সভ্য রাষ্ট্র।” এটাই তো হওয়া উচিত আমাদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ।

লেখক: ডাটা এনালিস্ট, এনওয়াইএস, যুক্তরাষ্ট্র

