রাশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্য কৌশলে আবারও ফিরছে পুরোনো ধাঁচের পণ্য বিনিময় বা বার্টার ব্যবস্থা। ১৯৯০-এর দশকের পর এবারই প্রথম এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রুশ কোম্পানিগুলো এখন গমের বিনিময়ে চীনা গাড়ি নিচ্ছে। তিসি বীজের বিনিময়ে আসছে নির্মাণসামগ্রী।
চীন ও ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবুও বার্টার ব্যবস্থার পুনরুত্থান দেখাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বাণিজ্য সম্পর্ককে কতটা বদলে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া সোভিয়েত পতনের পর পশ্চিমাদের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হয়েছিল। তিন দশক পর সেই ধারা ভেঙে পড়েছে।
২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও তাদের মিত্ররা রাশিয়ার ওপর ২৫ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। লক্ষ্য ছিল ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রুশ অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি সমর্থন কমানো। ওয়াশিংটন ভারতের ওপরও শুল্ক বসিয়েছে। কারণ দিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে তেল ব্যবসা করছে।
পুতিন বলছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করছে। পশ্চিমা পূর্বাভাস সত্ত্বেও গত দুই বছরে জি৭ দেশগুলোর তুলনায় রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। তিনি ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে সব রকম উপায় খুঁজতে। তবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে অর্থনীতি এখন টেকনিক্যাল মন্দায় রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতিও বেশি।
কঠোর কিছু পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ২০২২ সালে রুশ ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। গত বছর ওয়াশিংটন চীনা ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দেয়, তারা যেন রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা না করে। এতে দ্বিতীয় স্তরের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা বেড়েছে।
রাশিয়ার পেমেন্ট খাতের এক সূত্র রয়টার্সকে জানায়, “চীনা ব্যাংকগুলো ভয় পাচ্ছে তারা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চলে আসবে। তাই তারা রাশিয়ার টাকা নেয় না।” এই ভয়ের কারণেই বার্টার লেনদেন বাড়ছে। কারণ এসব লেনদেন শনাক্ত করা অনেক কঠিন।
২০২৪ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ১৪ পাতার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। সেখানে ব্যবসায়ীদের বলা হয় কীভাবে বার্টারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা যায়। এমনকি একটি বার্টার এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। ওই নির্দেশিকায় বলা হয়, “বার্টারের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে পণ্য ও সেবার অদলবদল করা যায়। এতে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজন নেই।”
দীর্ঘদিন এ ধরনের বাণিজ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। তবে গত মাসে রয়টার্স জানায়, চীনের হাইনান লংপ্যান অয়েলফিল্ড টেকনোলজি কোম্পানি সামুদ্রিক ইঞ্জিনের বিনিময়ে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় দিতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এই প্রতিবেদনের জন্য রয়টার্স অন্তত আটটি বার্টার লেনদেনের তথ্য নিশ্চিত করেছে। এগুলো এসেছে বাণিজ্য সূত্র, কাস্টমস সার্ভিস ও কোম্পানির বিবৃতির ভিত্তিতে। আগে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়নি। লেনদেনের মোট পরিমাণ কত, তা জানা যায়নি। তবে তিনটি বাণিজ্য সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের লেনদেন এখন বাড়ছে।
রাশিয়ান-এশিয়ান ইউনিয়ন অব ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরসের কর্মকর্তা মাকসিম স্পাস্কি বলেন, “বার্টারের বৃদ্ধি হলো ডি-ডলারাইজেশন, নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং অংশীদারদের তারল্য সমস্যার লক্ষণ।” তাঁর মতে, ভবিষ্যতে বার্টারের পরিমাণ আরও বাড়বে।
একটি বাণিজ্য সূত্র জানায়, এই ব্যবস্থা রুশ ব্যাংকগুলোকে ডলার ও ইউরো লেনদেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে সাহায্য করছে।
তিনজন বিশ্লেষক বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কাস্টমস সার্ভিসের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। এ বছরের প্রথমার্ধে এই ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার। তাদের মতে, এটিই বার্টার লেনদেন বৃদ্ধির ইঙ্গিত।
রাশিয়ার কাস্টমস সার্ভিস জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নানা ধরনের পণ্যে বার্টার হচ্ছে। তবে মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের তুলনায় এর সংখ্যা এখনও খুবই কম। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত কমেছে ১৪%। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭৭.২ বিলিয়ন ডলারে। এই সময়ে রপ্তানি কমেছে ১১.৫ বিলিয়ন ডলার। আর আমদানি বেড়েছে ১.২ বিলিয়ন ডলার।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বার্টার বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তারা শুধু বলেছে, আইন অনুযায়ী রিপোর্ট করা হলে এই তথ্যগুলো সামগ্রিক পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়ে যাবে।
রয়টার্স দুটি বাণিজ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত করে যে এক লেনদেনে রুশ গমের বিনিময়ে চীনা গাড়ি অদলবদল হয়েছে। এক সূত্র জানায়, চীনা অংশীদাররা রুশ অংশীদারদের টাকা না নিয়ে গম নিতে বলেছিল। চীনারা ইউয়ানে গাড়ি কিনেছিল। রুশরা রুবলে গম কিনেছিল। পরে গাড়ির বিনিময়ে গম দেওয়া হয়। তবে এর পরিমাণ বা মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি জানা যায়নি।
আরও দুটি লেনদেনে তিসি বীজের বিনিময়ে গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী এসেছে। একটি লেনদেনের আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ডলার। চীন রুশ তিসির বড় আমদানিকারক। তিসি শিল্প প্রক্রিয়ায় ও খাদ্যপণ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া ধাতুর বিনিময়ে চীন থেকে যন্ত্রপাতি এসেছে। কাঁচামালের বিনিময়ে চীনা সেবা দেওয়া হয়েছে। এক লেনদেনে পাকিস্তানও যুক্ত ছিল।
দুটি সূত্র জানায়, কিছু বার্টার লেনদেনে পশ্চিমা পণ্যও রাশিয়ায় ঢুকেছে। তবে সেসব পণ্যের বিস্তারিত জানা যায়নি।
আগস্টে কাজান এক্সপো ব্যবসায় ফোরামে চীনা কোম্পানিগুলো অর্থ পরিশোধের সমস্যার কথা জানায়। ওই অনুষ্ঠানে হাইনান লংপ্যান কোম্পানির চেয়ারম্যান জু শিনজিং বলেন, “বর্তমান সীমিত পরিশোধ ব্যবস্থায় বার্টার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।”
১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত পতনের পর বার্টার রাশিয়ার অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা এনেছিল। বিদ্যুৎ, তেল, আটা, চিনি থেকে শুরু করে জুতা পর্যন্ত পণ্য অদলবদলের দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরি হয়েছিল। এতে দাম নির্ধারণ জটিল হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিল। তখন নগদ অর্থের অভাব, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বারবার অবমূল্যায়নের কারণে বার্টার জনপ্রিয় হয়েছিল।
এখন অর্থের সংকট নেই। কিন্তু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ রাশিয়া ও চীনে বার্টারকে আবারও সামনে এনেছে।
রাশিয়া বলছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বেআইনি। চীন বলছে, এসব বৈষম্যমূলক।
বার্টারই একমাত্র সমাধান নয়। কেউ কেউ “পেমেন্ট এজেন্ট” ব্যবহার করছে। তারা ফি নিয়ে নানা কৌশলে লেনদেন করায়, যদিও ঝুঁকি বেশি। কেউ ব্যবহার করছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ভিটিবি, যার সাংহাইয়ে শাখা আছে। আবার কেউ ব্যবহার করছে ডলারের সঙ্গে যুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি।
রুশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিসিএস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট সের্গেই পুতিয়াতিনস্কি বলেন, “ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রিপ্টো ব্যবহার করছে। কেউ নগদ টাকা বহন করে। কেউ অফসেট পদ্ধতি ব্যবহার করে। কেউ আবার বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট ছড়িয়ে রাখে। এখনো কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সমাধান নেই। অর্থনীতি টিকে আছে। বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পাদ ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে ১০-১৫ ধরনের পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করছে।”
.
রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে সংবাদপ্রবাহের পাঠকদের জন্য লিখেছেন আকীল আকতাব।

