‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
-অন্নদাশঙ্কর রায়
পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমরা হারিয়েছিলাম জাতিরাষ্ট্রের জন্মের মহানায়ক, মহান দার্শনিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে বাংলাদেশের জন্মের সমগ্র ইতিহাসের পুনর্পাঠ দরকার। বঙ্গবন্ধুকে কেবল ১৯৭১ দিয়ে বোঝা যাবে না। তাঁকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে ১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের ধারাবাহিক মুক্তি-সংগ্রামকে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং এই অঞ্চলের হিন্দু জমিদার-মহাজনদের দ্বৈত শোষণে তখন বাংলার মুসলমান কৃষক নিষ্পেষিত। গোপালগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় বসে কিশোর মুজিব সেই শোষণ নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি দেখেছেন, কীভাবে জমিদারের লাঠিয়ালরা এসে গরিব প্রজার ফসল কেড়ে নিয়ে যায়, কীভাবে মহাজনের সুদের জালে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ব্রিটিশদের কাছ থেকে মুক্তি এবং কৃষকের মুক্তির জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রয়োজন। এই বিশ্বাস থেকেই ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালে তিনি বেঙ্গল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের প্রগতিশীল, গণমুখী ধারার একনিষ্ঠ কর্মী। তারা পাকিস্তানকে দেখেছিলেন হিন্দু-মুসলমান বিভাজন হিসেবে নয় বরং শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক, কৃষক-শ্রমিকের রাষ্ট্র হিসেবে।
১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের জন্য সারাদেশে, বিশেষ করে গ্রেটার ফরিদপুর অঞ্চলে ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিব যে অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়েছিলেন তা কিংবদন্তিতুল্য। রাতের পর রাত তিনি পায়ে হেঁটে, নৌকায় করে গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়ে মুসলমান কৃষকদের বুঝিয়েছেন পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা। তাঁর সেই অবদান ছাড়া এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের বিজয় ওমন নিরঙ্কুশ নাও হতে পারতো। পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁর এই ভূমিকাই প্রমাণ করে, তিনি শুরু থেকেই জনগণের নেতা ছিলেন, ক্ষমতার অলিন্দের নেতা ছিলেন না। সামন্তবাদ, জমিদার-জোতদার তন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন যোদ্ধা পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধুসহ প্রগতিশীল নেতৃত্বের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। তিনি দেখলেন ব্রিটিশ গেছে, কিন্তু জমিদার-জোতদার রয়ে গেছে। পাকিস্তানের মুসলিম লীগ দ্রুতই পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্তপ্রভু, সামরিকতন্ত্র এবং পূর্ব বাংলার জোতদার-জমিদারদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। যে কৃষকের ভোটে পাকিস্তান এলো, সেই কৃষকই আবার ভূমিহীন থেকে গেল। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে দীর্ঘ লড়াই। শোষণ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লড়াই করে গিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন যদি অর্থনৈতিক মুক্তি না আসে।

১৯৪৮ সালে তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন, তার মূল কর্মসূচিই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সময় এর মূল লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের অধিকার রক্ষা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা ও ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ। ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন যখন তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন, তখন সেই দলের ৪২ দফা ইশতেহারের প্রধান দাবি ছিল বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, খাস জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ, জোতদারি প্রথার অবসান এবং প্রজাস্বত্ব আইনের সংস্কার। এই লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ জমিদার-জোতদাররাই ছিল তখনকার মুসলিম লীগ সরকারের মূল ভিত্তি। ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ করানোর জন্য যে তীব্র গণ-আন্দোলন প্রয়োজন ছিল, তার মাঠ পর্যায়ের প্রধান কারিগর ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি কৃষক সমিতি গঠন করেছেন, কৃষকদের নিয়ে মিছিল করেছেন, জোতদারের কাছারি ঘেরাও করেছেন। তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন “লাঙ্গল যার, জমি তার।” এই একটি স্লোগান বাংলার কোটি কোটি ভূমিহীন মানুষকে তাঁর পেছনে নিয়ে আসে। তাঁর রাজনীতি তাই কেবল ভদ্রলোকের রাজনীতি ছিল না, তা ছিল হাটে-মাঠে, কৃষকের উঠোনের রাজনীতি। তিনি জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দেননি, তিনি তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর সোনার বাংলার স্বপ্নের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুই দশকে কারাবরণ, নির্যাতন এবং জনগণের সাথে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক তাঁকে ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা থেকে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান নেতায় পরিণত করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি কারাগারে থেকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন, অনশন করেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি জনগণের সামনে প্রমাণ করেছেন মুসলিম লীগের সামন্তবাদী রাজনীতি পরাজিত। ১৯৫৬ সালে তিনি যখন পূর্ব বাংলার মন্ত্রী, তখনো তিনি কৃষকদের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হলে যখন সবাই ভয়ে চুপ, তখন বঙ্গবন্ধুই ছিলেন প্রতিবাদের প্রধান কণ্ঠ। ১৯৬৬ সালে লাহোরে তিনি যখন ৬ দফা ঘোষণা করলেন, তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বললেও, পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক বুঝেছিল এটাই তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। ৬ দফা ছিল মূলত সামন্তবাদী-ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক ইশতেহার। এর পর ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করা হলো কিন্তু ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দিয়ে বাংলার মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে বসালো। চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে। পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হলো। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি পেয়েছিল মাত্র ৮১টি আসন। সাংবিধানিকভাবে, গণতান্ত্রিকভাবে, জনগণের রায়ে বঙ্গবন্ধু তখন সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান নেতা, পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের সংবাদমাধ্যম তখন তাঁকে “পাকিস্তানের নেক্সট প্রাইম মিনিস্টার” হিসেবে অভিহিত করেছিল। কিন্তু পাঞ্জাবি-সামরিক-সামন্তবাদী চক্র এই রায় মেনে নেয়নি। তারা বাঙালির হাতে, একজন কৃষক-দরদী নেতার হাতে ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে। তারা ঢাকায় আলোচনার নামে প্রহসন করে বাংলাদেশে সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে। মানুষের রায় নস্যাৎ করে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করলো পাকিস্তানের জান্তা প্রেসিডেন্ট ও শোষক গোষ্ঠী। যখন তারা গণতন্ত্রকে হত্যা করল, তখন বঙ্গবন্ধু জনগণকে স্বাধীনতার ডাক দিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই অমর ভাষণ – “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”- ছিল একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপান্তরিত করার মহাকাব্য। পাকিস্তানি মিলিটারি যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর ক্রাকডাউন করলো, অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যার সূচনা করলো; ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। তাঁর নামে, তাঁর নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। তিনি পাকিস্তানের প্রধান নেতা থেকে হয়ে উঠলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। স্বাধীনতার পর তিনি ফিরে এসে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে হাত দিলেন। তিনি জমিদার-জোতদারদের শোষণযন্ত্র আমলাতন্ত্রকে ভেঙে দিয়ে গরিবের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি ভূমিহীনকে খাস জমি দিচ্ছিলেন, গৃহহীনকে ঘর দিচ্ছিলেন, কল-কারখানা জাতীয়করণ করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এসব কারণেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে অংশ নিয়েছিল, যারা চেয়েছিল জমিদারি-সামন্তবাদী পাকিস্তান টিকে থাকুক, তারাই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তারা সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের ফল ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হত্যা করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করা এবং দেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায়, সামন্তবাদী-জোতদারি ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কারণ শুধু তিনি স্বাধীনতা এনেছেন বলেই নয়, তিনি যে রাষ্ট্রদর্শন দিয়েছিলেন সেই দর্শনই ছিল সাম্প্রদায়িক শক্তি, সামন্তবাদী ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। তিনি স্বাধীনতার পর মাত্র ১০ মাসের মধ্যে যে সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন, তা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রগতিশীল সংবিধান। সেই সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- প্রতিটিই ছিল জমিদার-জোতদার ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানে ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের কবর, সমাজতন্ত্র মানে ছিল জমিদারি ও পুঁজিবাদী শোষণের অবসান, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ছিল সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা আর রাষ্ট্র ও ধর্মের পরস্পরের উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং গণতন্ত্র মানে ছিল সামরিক-স্বৈরতন্ত্রের অবসান। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু পতাকা বদলালে মুক্তি আসে না। তাই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দিয়েছিলেন, যা ছিল সরাসরি গরিব কৃষকের পক্ষে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তিনি পরিত্যক্ত কল-কারখানা জাতীয়করণ করে শ্রমিকদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন যাতে পাকিস্তানি ২২ পরিবারের মতো এদেশে নতুন কোনো জোতদার শ্রেণি গড়ে উঠতে না পারে। আজ যখন আমরা দেখি গ্রামে এখনও ভূমিহীন কৃষক আছে, শহরে এখনও শ্রমিক বঞ্চিত তখন বুঝতে হবে বঙ্গবন্ধুর লড়াইটা এখনো অসমাপ্ত। তিনি যে বৈষম্যহীন অর্থনীতির কথা বলেছিলেন তা আজকের দিনে আরও প্রাসঙ্গিক।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন সামরিক ক্যু বললে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। প্রতিটি সূত্র প্রমাণ করে এটি ছিল ১৯৭১ সালের পরাজিত স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির চূড়ান্ত প্রতিশোধ। যে শক্তি ১৯৭১ সালে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তারাই ১৯৭৫ সালে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। খুনিরা কারা ছিল? খন্দকার মোশতাক আহমদের মতো পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিবিদ যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানের সাথে আপস করতে চেয়েছিল; কর্নেল রশিদ, ফারুক, ডালিমের মতো বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা, যারা পাকিস্তানি সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষিত এবং পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিল। পেছনে ছিল একাত্তরে পরাজিত জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের মতো দল এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যারা কখনোই একটি অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি। তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, যিনি ছিলেন তাঁর সকল সংগ্রামের প্রেরণা। তারা হত্যা করেছে শিশু শেখ রাসেলকে, যে ছিল নিষ্পাপ। হত্যা করেছে শেখ কামাল, শেখ জামালের মতো তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে এটি রাজনৈতিক নির্মূলীকরণ ছিল, ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের উপর আঘাত। ১৫ আগস্টের পর তারা যা করেছিল সেটাই প্রমাণ করে তাদের উদ্দেশ্য। তারা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের বিচার বন্ধ করে দিয়েছিল, তারা জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ করেছিল, তারা বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে ফেলেছিল, তারা কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল। তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর রক্তের ঋণ শোধ করার একটাই পথ- তাঁর স্বপ্নের শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ শুধু তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া নয়। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ হলো যে সামন্তবাদ, জমিদার-জোতদার তন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন, সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখা। যে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি তাঁকে হত্যা করেছে, তাদের আদর্শকে চিরতরে পরাজিত করা। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধু কোনো দলের সম্পত্তি নন, তিনি সমগ্র জাতির। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সাহসী সৈনিক থেকে কীভাবে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হয়েছেন এই ইতিহাস। তাঁর আদর্শই পারে আমাদের পথ দেখাতে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন কৃষকের ফসলে, শ্রমিকের স্বপ্নে,মানুষের হৃদয়ে। বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু।

