ভিকারুননিসা নূন-এক নাম, এক দর্শন, এক চ্যালেঞ্জ। ইউরোপে জন্মগ্রহণ করা, ইংল্যান্ডে শিক্ষিত এই নারী দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। ভিকি হিসেবে পরিচিত, তিনি নিজের পরিচয়কে কেবল ব্যক্তিগত সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং নারীর মুক্তির প্রশ্নকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, নারী শিক্ষা কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
১৯২০ সালের জুলাইয়ে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ভিকারুননিসা নূন ইংল্যান্ডে শিক্ষালাভের মাধ্যমে ইউরোপীয় শিক্ষাদর্শ ও সংস্কৃতি গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর জীবন ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন, যা তাঁকে উপমহাদেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে যুক্ত করেছে। স্যার ফিরোজ খান নূনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ এই সংযোগকে আরও দৃঢ় করে। ফিরোজ খান নূন ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাজনীতিক এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এই সম্পর্ক ভিকারুননিসা নূনকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিকটবর্তী করেছিল, কিন্তু তিনি সেই ক্ষমতাকে কেবল সামাজিক মর্যাদার অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও জনসেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৪৫ থেকে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা-পূর্ব অস্থির সময়ে, ভিকারুননিসা নূন রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি আটকও হন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়কেন্দ্রিক ঘটনা, যা প্রমাণ করে যে তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রশ্ন ও সংহতির পথে ছিলেন। একজন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে তিনি চাইতে পারতেন নিরাপদ জীবন, কিন্তু সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি স্বতঃসিদ্ধ সমাজসেবার একটি রূপ তৈরি করেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়, পূর্ব পাঞ্জাবে লেডি নূন তাঁর পারিবারিক সম্পত্তিতে অবস্থান করছিলেন। এই সময়ে তাঁর বাড়ি পুড়ে যায় এবং নিরাপত্তাহীনতায় তিনি মান্ডি রাজ্যের স্থানীয় হিন্দু শাসকের কাছে আশ্রয় নেন-যিনি পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভি. পি. সিংয়ের পরিবার হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীকালে তাঁকে স্বামীর সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য নতুন সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, লেডি নূন কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ছিলেন না; তিনি ব্যক্তিগত বিপর্যয় মোকাবেলাতেও দৃঢ় ছিলেন।
ভারত ভাগের কিছু কাল পরে ১৯৫০ সালে ফিরোজ খান নূনকে পূর্ব বাংলার প্রথম পাকিস্তানি গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়; তখন লেডি নুন পুর্ব বাংলায় তিনি সমাজসেবামূলক কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ঢাকায় ভিকারুননিসা বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, যা আজকের বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তিনি অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন (APWA)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন, যা নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অধিকার প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে কাজ করেছিল।
লেডি নূন তাঁর স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৩ সালে স্যার ফিরোজ খান নূন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এবং ১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জার সামরিক আইন ঘোষণার মাধ্যমে তাঁর স্বামীর সরকারী দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়। স্বামীর মৃত্যু হয় ১৯৭০ সালে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেও লেডি নূন কেবল পাশে থাকা স্ত্রী ছিলেন না; তিনি সক্রিয়ভাবে জনসেবা, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
১৯৫৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত লেডি নূন পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালে তিনি দুর্যোগকালীন সহায়তা, মানবিক সেবা এবং সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্ব ও নিষ্ঠা প্রমাণ করে, তিনি কেবল রাজনৈতিক স্তরের অনুসারী ছিলেন না; বরং সমাজে একটি শক্তিশালী জনসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
নারী শিক্ষার প্রসারে ভিকারুননিসা নূনের অবদান অনন্য। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছেন যা আজকের বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মর্যাদাপূর্ণ। ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক বাস্তবতায় মেয়েদের আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্তি ছিল সীমিত। ভিকারুননিসা নূন এই প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছিলেন এবং একটি নিরাপদ, আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে মেয়েদের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
ভিকারুননিসা নূনের শিক্ষা দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল চাকরির যোগ্যতা তৈরি করার বিষয় ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর শিক্ষা মানে আত্মসম্মানবোধ, যুক্তি করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা অর্জন। এই দর্শনের বাস্তবায়নে তিনি ইতিহাস, ভাষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নারীকল্যাণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে বিস্তৃত। অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন (APWA)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তিনি নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অধিকার সংক্রান্ত কাঠামোগত পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর যুক্তি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তিনি পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্টের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে দুর্যোগকালীন সহায়তা ও মানবিক সেবার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন।
১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কূটনৈতিকভাবে তিনি পর্তুগালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯৮৭-১৯৮৯)। এই সময়ে তিনি আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করেন এবং পাকিস্তানের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি অবদান নুন স্কলার্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দান ও ব্যক্তিগত অর্থায়নের মাধ্যমে এই কর্মসূচি পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ প্রদান করেছিল। তবে শিক্ষার্থীদের শর্ত ছিল-দেশে ফিরে জাতীয় সেবায় নিয়োজিত হওয়া। এই প্রক্রিয়াই প্রমাণ করে যে ভিকারুননিসা নূনের দর্শন কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ধারাবাহিকতা ও বর্তমান অবস্থা
ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ধারাবাহিকতা ১৯৫২ সালে শুরু হয়, যখন বেইলি রোডে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল কেবল শিক্ষাদানের নয়, বরং মেয়েদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশে সমান গুরুত্ব দেওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়টি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয় এবং নতুন নতুন শাখা সম্প্রসারণ লাভ করে, যার ফলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত সাত দশকের মধ্যে বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা লক্ষাধিক পৌঁছেছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান শিক্ষাক্ষেত্রে ও সামাজিক অঙ্গনে স্পষ্ট। তবে, সমসাময়িক বিশ্লেষণ দেখায় যে, উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষার মান, আধুনিক পাঠ্যক্রমের প্রবর্তন ও নারীর নেতৃত্বের বিকাশে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে প্রথাগত ব্যবস্থাপনা এখনো আধুনিক শিক্ষানীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয়হীন। এভাবে, প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব রেখেছে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে আরও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
আজ, নুন ফাউন্ডেশন তাঁর দর্শন ও উত্তরাধিকারের ধারাকে বহন করছে। শিক্ষা, জনসেবা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এটি ভিকারুননিসা নূনের মূল দর্শনকে জীবন্ত রাখছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে-আমরা কি শুধুই নামের মর্যাদা পালন করছি, নাকি তাঁর দর্শনকেও আমরা জীবন্ত রাখছি? বর্তমান নারীর শিক্ষা পরিসংখ্যানে উন্নতি হলেও বাস্তবিক ক্ষমতায়ন কোথায়? সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতা, এবং সমাজে আত্মনির্ভরতা কি বর্তমান শিক্ষানীতিতে সমানভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?
ভিকারুননিসা নূন নারীকে মানুষ বানাতে চেয়েছিলেন। আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা নারীকে শিক্ষিত করছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে শক্তিশালী করছে কি? পাঠ্যক্রমে দক্ষতা থাকলেও বাস্তব জ্ঞানে স্বাধীনতা নেই। ফলাফলে সাফল্য থাকলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনায় নারীর অবস্থান সীমিত। তিনি নারীকে প্রশ্ন করার, আত্মনির্ভর হওয়ার এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সঙ্গে দাঁড়ানোর যোগ্যতা দিতে চেয়েছিলেন। এই দিকেই আজকের শিক্ষানীতি ব্যর্থ।
রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এটি এক অস্বস্তিকর আয়না। কারণ ভিকারুননিসা নূন নারীকে মানুষ বানাতে চেয়েছিলেন। এবং মানুষ মানে-চিন্তা, প্রশ্ন, প্রতিরোধ এবং দায়বদ্ধতা। আজকের শিক্ষানীতি যদি এই দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে নারী শিক্ষার সমস্ত অর্জনই অসম্পূর্ণ থাকবে।
ভিকারুননিসা নূনের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে, শিক্ষা কেবল যোগ্য জনশক্তি তৈরির মাধ্যম নয়; এটি শক্তিশালী, স্বাধীন, এবং নৈতিকভাবে সচেতন মানুষ তৈরির যন্ত্র। এই শিক্ষা দর্শনই নারী শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আজ যখন আমরা শিক্ষার প্রসারকে উদযাপন করি, আমাদের উচিত-তার দর্শনকেও একইভাবে পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
তিনি ইতিহাসে কেবল একটি নাম নয়; তিনি সেই দর্শনের উদাহরণ, যা রাষ্ট্র, সমাজ এবং নারী শিক্ষার ভবিষ্যতকে প্রশ্নবিদ্ধ ও চ্যালেঞ্জিং করে রাখে। ভিকারুননিসা নূনের জীবন এবং কর্ম আমাদের কাছে বার্তা দিয়েছে-নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, শিক্ষাব্যবস্থার এবং সমাজের। এবং যতদিন আমরা এই দর্শনকে উপেক্ষা করব, নারী শিক্ষা ততদিন সম্পূর্ণ হবে না।
লেখক: সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী
সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার(সিবিটি)
email: theatrecbt@gmail.com

