খসরু আহমেদ খান
পলাশীর প্রান্তরে কোনো যুদ্ধ হয়নি। সেদিন হয়েছিল আত্মবিশ্বাসের বিপর্যয়, হয়েছিল ভালোবাসার বিশ্বাসঘাতকতা। এক তরুণ নবাব বুকের ভেতর আগুন নিয়ে এসেছিলেন যুদ্ধের মাঠে। আর প্রাসাদের বুকে গোপনে আগুন জ্বালাচ্ছিলেন তার আপনজনেরা। একদিকে ইংরেজ বাহিনী প্রস্তুত, অন্যদিকে নবাবের সেনাবাহিনীর অনেকেই নিরুত্তাপ, নিস্তব্ধ। তারা জানে কী হতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই বলে না, কিছুই করে না। মীরজাফরের মতো একজন ব্যক্তি শুধু শত্রু ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নীরব ছায়া, যাকে বিশ্বাস করে নবাব তার সাম্রাজ্য গড়েছিলেন। কিন্তু সেই ছায়াই একসময় তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নেয়।
সিরাজ যখন মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তিনি ভাবেননি যে তাকে একা লড়তে হবে। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন—মাটি, মানুষ, ইতিহাস সবই তার পক্ষে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, তার চারপাশের মানুষগুলো কেবল তাকিয়ে আছে, কিন্তু এগিয়ে আসছে না। তারা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ঠান্ডা। তারা সৈনিক, কিন্তু প্রাণহীন। তখন একসময় তিনি কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, “আমার কেউ নাই?” এই একটিমাত্র বাক্য শুধু এক তরুণ শাসকের হতাশা ছিল না; এটা ছিল একটি জাতির আত্মার হাহাকার, মুখোশ খুলে পড়ার মুহূর্ত।
নবাব বন্দি হন। শহরের রাস্তা ধরে যখন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কেউ কাঁদে না, কেউ মুখ ঘোরায় না, কেউ বলে না, “এই লোক আমাদের নবাব, তার জন্য কেঁদে নিতে পারি।” বরং চারপাশে ছিল বিদ্রূপ, থুতু, হাসি। কিছু নির্লজ্জ মানুষ মুখে মুখে বলছিল, “এই লোকটাই না, যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছিল?”
হায়রে বাঙালি! নিজের কণ্ঠ বন্ধ করে পরাধীনতার মালা গলায় পরিয়ে নিতে তোমাদের একটুও বাধল না? কীভাবে পারলে এক নবাবের চোখের জলকে উপহাসে বদলে দিতে? কীভাবে পারলে সেই মানুষটিকে একা ফেলে দিতে, যে তোমাদের জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল? সিরাজ শুধু ব্রিটিশদের হাতে নিহত হননি; তার মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তার আপনজনের নীরবতা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং জাতির আত্মসমর্পণ।
তিনি মারা গেলেন অন্ধকার কারাগারে। তার পাশে কেউ ছিল না। তার শেষ প্রহরে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করেনি, কিছু বলতে চান কিনা। কেউ সাদা কাপড় আনেনি, কেউ দাফনের ব্যবস্থা করেনি। এক হতভাগা দরিদ্র ব্যক্তি বলেছিল, “আমার কাছে একটা কাপড় আছে, ঢেকে দিই?” কিন্তু সেই প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। সিরাজের দেহ পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ। আর শহরের অন্যপ্রান্তে বাজে উল্লাসের ঢোল—ইংরেজ এসেছে, সাহেব এসেছে, বিজয় হয়েছে!
আজ আমরা সবাই ঘৃণায় উচ্চারণ করি মীরজাফরের নাম। কিন্তু আমরা কি নিজেদের একবার আয়নায় দেখি? আমরা কি জানি, মীরজাফর মরেনি? সে আজও বেঁচে আছে। তার রক্ত এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এখনো অনেক বাঙালির অন্তরে সে বাস করে। বিশ্বাসঘাতকতা আজও জীবিত, যখন কেউ দেশের পক্ষে কথা বলে আর আমরা তাকে একা করে দিই। তখন সেই পুরোনো প্রশ্ন আবার জেগে ওঠে—“আমার কেউ নাই?”
সিরাজ আমাদের সুযোগ দিয়েছিলেন ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। কিন্তু আমরা সুযোগের বদলে পা ধরেছিলাম পরের। তার রক্তে লেখা হয়েছিল এক নবাবের আর্তনাদ, আর আমাদের নীরব সম্মতিতে লেখা হয়েছিল এক জাতির আত্মহত্যা। সেই আত্মহত্যা আজও চলছে—নতুন রূপে, নতুন ভাষায়, নতুন প্রতারণায়।
আজ যদি আমরা না জাগি, যদি আমরা নিজেরাই নিজের ইতিহাসের দিকে মুখ না তুলি, তাহলে আমরা শুধু সিরাজকে নয়, নিজেদের আত্মাকেও বারবার খুন করব। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাক্যটি হয়ে থাকবে এই—এক নবাব কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আমার কেউ নাই…” আর পুরো এক জাতি তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
আজও আমরা সেই চুপ করে থাকা জাতি। আজও আমরা অন্যায়ের পায়ে গোলাপ ছুঁড়ে দিই, সত্যের কণ্ঠ রোধ করে উল্লাস করি। আর প্রতিবার কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে বলি, “এখন সময় নয়।”
হায়রে হুজুগের বাঙালি! আমরা এমন কেন? আমরা ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে আবেগে ভাসি, হুজুগে মাতি, কিন্তু বিবেকের সামনে দাঁড়াতে ভুলে যাই। কবির ভাষায় বলতে হয়, “বাঙালি করে জন্ম দিয়েছ মোদের, মানুষ করোনি।” আর এই অমানুষিকতা নিয়েই আমরা বারবার হারিয়ে ফেলি নিজের আত্মা, নিজের অধিকার আর নিজের ভবিষ্যৎ।
লেখক: কলামিস্ট

