২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনকাল সমাপ্ত হয়। ওই সময় বিরোধী মত দমন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি এবং স্বার্থপর নীতি সমগ্র সমাজে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের উচ্চপদস্থ নেতারা দেশে থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
পলাতক নেতাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানের পর এবার দেখা গেছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এবং কলকাতায় ‘কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এই কার্যালয়গুলো অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানায়। সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের মাটিতে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত হতে না দেওয়া হলে তা দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়াও বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের মাটিতে দলের সিনিয়র নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের সম্প্রসারণ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষত, এই ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের জনমত উত্তেজিত করতে পারে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মসৃণতা বিঘ্নিত করতে পারে।
চলতি বছরের ২১ জুলাই একটি অস্পষ্ট এনজিওর আড়ালে দলের কিছু সিনিয়র নেতা দিল্লি প্রেস ক্লাবে গণসংযোগ কর্মসূচি চালিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে বুকলেট বিতরণ করা হয়েছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনও এই কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমানতার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের দেশের মাটিতে অন্য দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতিটি ‘ভুলভাবে উপস্থাপন’ করা হয়েছে। তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ভারত আশা করে যে বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যাতে জনগণের ইচ্ছা ও রায় নিশ্চিত হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের মাটিতে স্থাপিত কার্যালয়গুলো শুধু রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উপায় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। হাসিনার পতনের পর ভারতীয় কিছু মিডিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক শাসক দলের পক্ষে ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার এসব তথ্য যাচাই করে মিথ্যা প্রমাণ করেছে, তবে পদক্ষেপ নেবার পরিবর্তে ভারতের সরকারি দলের কিছু নেতা এই প্রচারণায় উত্সাহ প্রদর্শন করেছেন এবং অংশ নিয়েছেন।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের কিছু নীতি এবং ভিসা সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের নাগরিকদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা এবং নয়াদিলির মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রয়েছে।
উভয় পক্ষই কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে পারস্পরিক আস্থা বজায় থাকে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের মাটিতে স্থাপিত কার্যালয়গুলো বন্ধ করা এবং দ্বিপাক্ষিক স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম রোধ করা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

