অতীতের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক। দুই দেশ এখন প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
আগামী মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি)-এর চতুর্থ বৈঠক। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈঠকে অংশ নিতে ঢাকায় আসছেন তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিন্চি, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
এফওসি বৈঠকের পাশাপাশি তুর্কি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিন্চি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এছাড়া তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বৈঠক করবেন, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঙ্কারার যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়।
এফওসি বৈঠককে সামনে রেখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যেখানে বাংলাদেশের বেশির ভাগ পণ্য আমদানি করা হয়। তবে বৈঠকে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে জোর দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে এবং তুরস্ক ঢাকায় বিশ্বমানের হাসপাতাল স্থাপনে সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় গুরুতর আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে তুরস্ক সমর্থন জানিয়েছে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হিসেবে তুরস্ক এর কঠোর সমালোচনা করেছিল, যা সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, আঙ্কারা এখন কৌশলগতভাবে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গভীর করতে আরও বেশি আগ্রহী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব ও প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থার প্রধানের মতো উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ঢাকা সফর এই আগ্রহেরই প্রমাণ। তাদের সফরের মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান তুরস্ক সফরে রয়েছেন, যেখানে তিনি সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করছেন এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছেন। এফওসি বৈঠকে তুরস্কের আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবমিলিয়ে, ঢাকা ও আঙ্কারা এখন একটি ফলপ্রসূ ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের পথে হাঁটছে, যা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে।

