বাংলাদেশের বাম ধারার অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখে গেছেন, ভেবেছেন এবং সক্রিয় থেকেছেন। লেখক, গবেষক, তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী রাজনীতিবিদ হিসেবে তার নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৌদ্ধিক পরিসরে অনন্য হয়ে থাকবে।
১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে জন্ম নেওয়া উমরের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রাজনৈতিক আবহের মধ্যে। তার পিতা আবুল হাশিম ছিলেন মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। পারিবারিক এই ঐতিহ্যই বদরুদ্দীন উমরকে রাজনীতির দিকে টেনে নেয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ও তার পিতা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি লিখেছেন বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ। তিন খণ্ডে প্রকাশিত পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি এই বিষয়ে অন্যতম প্রামাণ্য কাজ হিসেবে বিবেচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে আসেন। তবে ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে বিপ্লবী রাজনীতিতে যোগ দেন।
১৯৭০-৭১ সালে তিনি দৈনিক গণশক্তির সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দলীয় মতাদর্শে দ্বিমত দেখা দিলে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে দাঁড়ান। পরে বাংলাদেশ লেখক শিবির, কৃষক ফেডারেশন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন।
তার লেখায় বারবার উঠে এসেছে সমাজের বৈষম্য, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা ও কৃষকের সংগ্রামের বিষয়। সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতি, বাঙালীর সমাজ ও সংস্কৃতির রূপান্তর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক—এসব বই তাকে চিন্তাশীল পাঠকের কাছে অপরিহার্য করে তোলে।
বদরুদ্দীন উমর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন। চলতি বছর তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেন। তার ভাষায়, ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি কোনো সরকারি বা বেসরকারি পুরস্কার গ্রহণ করেননি, কারণ তিনি মনে করতেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার গ্রহণ তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি লিখেছেন ও মত দিয়েছেন। তার আত্মজীবনী আমার জীবন গ্রন্থে তিনি শুধু নিজের জীবনের গল্পই বলেননি, বলেছেন একটি সময়ের ইতিহাস, সংগ্রাম ও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নের কথা।
বাংলাদেশের বামপন্থি চিন্তাধারার বিকাশে বদরুদ্দীন উমরের অবদান গভীর। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও লেখক। তার জীবনপ্রবাহ এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চর্চায় চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

