আজাহার আলী সরকার
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বশেষ সংযোজন—পার্বত্য চট্টগ্রামে স্টারলিঙ্ক চালু। ই-লার্নিংয়ের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় স্টারলিঙ্ক সংযোগ চালু করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০০টি স্কুলে স্টারলিঙ্ক সংযোগ ব্যবহার করে এই প্রকল্প পরিচালিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই এই প্রকল্পে স্টারলিঙ্ক ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন।
সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে আমরা যদি ইরানের দিকে তাকাই, দেখা যায়, যখন ইরান সে দেশে মোসাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে সরকারি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়, তখন এলন মাস্ক ঘোষণা দিয়ে ইরানে স্টারলিঙ্ক সংযোগ চালু করেন। এই সংযোগ ব্যবহার করেই মোসাদের গোয়েন্দারা ইরানে একের পর এক অন্তর্ঘাতমূলক হামলা পরিচালনা করেছে। ইউক্রেন সেনাবাহিনীও এই সংযোগ ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে।
ভারত অভিযোগ করছে, সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের বিদ্রোহীরা এই সংযোগ ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই অভিযোগ করছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার—সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই স্টারলিঙ্ক সংযোগ ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়।
এ থেকে বোঝা যায়, স্টারলিঙ্ক সংযোগ কেবল বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয় না; বরং সামরিক ও সরকারবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার একটি জনপ্রিয় ও কার্যকর মাধ্যম। সেকারণে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি অঞ্চলে—যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে—সেখানে এ ধরনের সংযোগ চালুর পূর্বে সরকারের উচিত ছিল নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঝুঁকি ও হুমকি বিশ্লেষণ (থ্রেট ও রিস্ক অ্যানালাইসিস) করে অগ্রসর হওয়া।
বাংলাদেশে কেবল নয়, ভারতের সেভেন সিস্টার্স ও মিয়ানমারের সন্নিহিত প্রদেশগুলোতেও যেসব বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম চলছে, স্টারলিঙ্ক সংযোগ সেই গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে কিনা, সেটাও সরকারের বিবেচনায় আনা উচিত ছিল। একইসঙ্গে, তিনদেশীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ স্থাপনে এই নেটওয়ার্ক কোনো ভূমিকা রাখবে কিনা, তা ভেবে দেখাও জরুরি। এই সুবিধা চালু হলে বাংলাদেশ থেকে রিসিভার কিনে ওইসব অঞ্চলে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে কিনা, সেটাও পরিষ্কার নয়। এমন কিছু ঘটলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। এমনকি চীনও এ বিষয়টি ভালোভাবে নেবে না—এমনটা বলার যথেষ্ট ভিত্তি আছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে স্টারলিঙ্ক সংযোগ অনিয়ন্ত্রিত। ফলে, এর মাধ্যমে কী ধরনের তথ্য আদান-প্রদান হবে, তা মনিটরিং করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বাংলাদেশের হাতে নেই। সরকারও এর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। উপরন্তু, যারা এসব প্রকল্পে শিক্ষক হিসেবে কাজ করবেন বা পরিচালনায় থাকবেন, যদি তাদের কেউ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, তাহলে সহজেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য প্রচার করে ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। শুধু সশস্ত্র কার্যক্রম নয়—মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং মানব পাচারের একটি অভয়ারণ্য এই ত্রিদেশীয় দুর্গম অঞ্চল।
তিন দেশের অপরাধীরা এই দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলের সুবিধা নিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। স্টারলিঙ্কের এই সুযোগ সেই অপরাধ কর্মকাণ্ডকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আরও নির্বিঘ্ন করে তুলতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে এই স্টারলিঙ্ক সংযোগ যতটা না ই-লার্নিং ও শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে দেশের জনগণের উদ্বেগ কিংবা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন বোধ করছে না। পশ্চিমা স্বার্থ ও এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই সরকার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থকে তুচ্ছ করে চলেছে। দেশের সব রাজনৈতিক দল বন্দর ও করিডর ইস্যুতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিলেও সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় বাংলাদেশে খোলার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ হলেও, সরকার কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে অনুমতি দিয়েছে। এমনকি তাদের আবাসিক প্রতিনিধি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব,
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ফোরাম

