নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা Epistaxis আমাদের সমাজে খুবই পরিচিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এটি দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সামান্য কারণে ঘটে এবং কিছু সময়ের মধ্যেই নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। তবে অনেক সময় এর পেছনে গুরুতর কারণও থাকতে পারে। তাই নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে অবহেলাও করা উচিত নয়।
নাকের ভেতরের অংশে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি থাকে। সামান্য আঘাত, নাক খোঁটা কিংবা অতিরিক্ত শুষ্কতার কারণেও এসব রক্তনালি ফেটে যেতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়া, ঠান্ডা বাতাস, সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি বা সাইনাসের সমস্যাও অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ হয়। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া রক্ত পাতলা করার ওষুধ, যেমন অ্যাসপিরিন সেবনের ফলেও অনেক সময় নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নাকে বারবার আঙুল দেওয়া একটি সাধারণ কারণ। আবার তুলনামূলকভাবে কম হলেও নাকের ভেতরে টিউমার, ক্যান্সার, জন্মগত কিছু সমস্যা, লিভারের জটিলতা কিংবা কিছু রক্তরোগের কারণেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।
হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করেন। অথচ কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব। নাক দিয়ে রক্ত পড়লে প্রথমে সোজা হয়ে বসতে হবে এবং মাথা সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে। এরপর নাকের সামনের নরম অংশ আঙুল দিয়ে কয়েক মিনিট চেপে ধরলে সাধারণত রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই মাথা পেছনে নিয়ে যান, যা ঠিক নয়। এতে রক্ত গিলে ফেলার ঝুঁকি থাকে এবং তা পরবর্তীতে বমি বা অন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
তবে কিছু পরিস্থিতিতে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। যদি বারবার চাপ দেওয়ার পরও রক্ত বন্ধ না হয়, খুব ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, মাথা ঘোরে বা দুর্বলতা অনুভূত হয়, অথবা বড় ধরনের আঘাতের পর রক্তপাত শুরু হয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তের কোনো রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। বিশেষ করে কোনো শিশুর যদি বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, তাহলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এই সমস্যাটি প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কিছু সহজ অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাক খোঁটা এড়িয়ে চলা, ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখা, নাক বেশি শুষ্ক হয়ে গেলে saline spray বা সামান্য ভ্যাসলিন ব্যবহার করা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ইত্যাদি বিষয় মেনে চললে অনেকাংশে ক্ষেত্রেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ঠান্ডা ও অ্যালার্জির সমস্যাগুলো ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়াও জরুরি।
নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞদের কাছে যখন এমন রোগী আসেন, তখন রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস শোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো Nasoendoscopy। এই এন্ডোস্কোপিক পরীক্ষার মাধ্যমে নাকের ভেতরের অংশ সরাসরি দেখা যায় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা যায় ঠিক কোন জায়গা থেকে রক্তপাত হচ্ছে বা নাকের ভেতরে কোনো টিউমার বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না। ফলে রোগ নির্ণয় সহজ হয় এবং চিকিৎসাও দ্রুত ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ একটি সমস্যা হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের ভেতরের অন্য কোনো জটিলতার ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই সচেতনতা, সঠিক প্রাথমিক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই হতে পারে এই সমস্যার সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান।