আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর যে নামটি অনিবার্যভাবে এসে যায়; সেই নামটি হলো বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বে ও উত্তরকালের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
খ্যাতিমান এই রাজনীতিবিদ ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। গণতান্ত্রিক যুবলীগের নেতৃস্থানীয় সদস্যও ছিলেন তিনি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তার কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান তাকে সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ’৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাজউদ্দীনের। ছয় দফা আন্দোলনে তাজউদ্দীন ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করেন শেখ মুজিবকে।
শেখ মুজিব যেদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন; সেদিনই তাজউদ্দীন হন সাধারণ সম্পাদক। শুরু হয় বাংলার রাজনৈতিক আকাশে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন জুটির ঘনিষ্ঠভাবে পথ চলা। আর এই রাজনৈতিক জুটির ঘনিষ্ঠতা দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাই পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সামরিক সরকার তখন থেকেই শেখ মুজিবের কাছ থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাজউদ্দীনকে ভয় পেত। ভয় পেত তাঁর প্রখর মেধা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি এবং কৌশলকে। তাই তাকে ঢাকা জেল থেকে ময়মনসিংহ জেলে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। কেননা তাজউদ্দীনের মেধা, যোগ্যতা, দূরদর্শিতা ও বিশ্বস্ততার প্রতি শেখ মুজিবের ছিল প্রগাঢ় আস্থা।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দেশি—বিদেশি চক্রান্ত গোপনে কাজ করে যাচ্ছিলো যা নিয়ে, সেটা ছিল তাজউদ্দীন আহমদকে বঙ্গবন্ধুর আস্থা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া এবং সেটা নতুন ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
চক্রান্তকারীরা এটা ভালো করে বুঝেছিলো বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন একত্রে থাকলে তাদের স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না। তাই তারা প্রথমে চেষ্টা করে বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝিয়ে তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে দিতে। মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করার পর এ নিয়ে এম আর আখতার মুকুল দু:খ নিয়ে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কোমর থেকে শানিত তরবারি অদৃশ্য হয়ে গেল।’
এই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার পর যে ন্যারেটিভটা এস্টাবলিশ করার অভিপ্রায় এতদিন ধরে চলমান তার শিরশ্ছেদ এখনো ঘটানো যায়নি। বরঞ্চ তা আরও দ্বিগুণ গতিতে রাজনৈতিক গতিধারায় চলমান রয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাকশাল প্রশ্নে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নিয়ে তাজউদ্দীনের দূরত্ব তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা করা হয়েছে এতদিন, তা আসলে কতটুকু সত্য।
বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদকে কেন মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে ছিলেন সেটা নিয়ে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা হয়নি। কোনো গবেষক এই বিষয়টিকে কার্যকারণ সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যাও করেননি। বঙ্গবন্ধু সেই সময়ে যতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো বাকশাল। সেই বাকশালের মূল তাত্ত্বিক কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ। তা হলে বিরোধটা বাঁধলো কেন? কেউ কেউ ফজলুল হক মনির সাথে দ্বন্দ্বের কথা বলেন।
দ্বন্দ্ব থাকতেও পারে। কিন্তু এতবড় একটা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শুধু মাত্র একটি ব্যক্তির দ্বন্দ্বের কারণে ঘটেছে সেটা রাজনৈতিক বিজ্ঞানসম্মত নয়। এমনও নয় যে, তাজউদ্দীনকে সরিয়ে সেখানে শেখ মনিকে বসানো হয়েছে। তাজউদ্দীনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। তাহলে পিছনের ঘটনা কী?
বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে তাজউদ্দীন আহমদকে কিছুটা আড়াল করে দেন। এই আড়াল করার কারণ নিয়ে অনেক তত্ত্ব—ই আলোচনায় আসে, বাতাসে ভাসে তার কতটুকু বা কোনটি সত্য সেটি ভিন্ন আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু এই আড়াল করাটা যে বিচ্ছিন্নতা ছিল না, তাজউদ্দীন আহমদ জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করে গেছেন।
বাকশাল নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের বিভিন্ন বক্তব্য কিংবা তার রাজনৈতিক মতাদর্শগুলো নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। তাই ষড়যন্ত্রকারীরা বাকশাল সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের দূরত্বের যে রাজনৈতিক বয়ান মাঠে ছেড়ে দিয়েছে সেটা আসলে তাত্ত্বিকভাবে ভুল।
তাজউদ্দীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর যে বিষয়টা নিয়ে প্রথম মতবিরোধ ঘটে সেটা হলো, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে ইসলামি ঐক্য সংস্থার সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিপরীতে অবস্থান নেন।
কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যস্থতার ফলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যকার জমাট বরফ গলতে শুরু করে। মিশর, সিরিয়া, লিবিয়া, কুয়েত, আলজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার নেতারা শেখ মুজিবকে আশ্বাস দেন যে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক মোটামুটি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশ সৌদি আরব ও চীনের স্বীকৃতি লাভ করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যেও বহু প্রকৃত বন্ধু পাবে। এসব মধ্যস্থতাকারীর ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে ইসলামাবাদ ও ঢাকা থেকে দুই দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময়ের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। স্বীকৃতি বিনিময়ের পরদিন একটি আরব রাষ্ট্রপ্রধানের বিশেষ বিমান ঢাকায় আসে শেখ মুজিবকে লাহোর নিয়ে যাওয়ার জন্য। ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিব লাহোরে গিয়ে ইসলামি সম্মেলনে যোগ দেন। লাহোর যাত্রার আগে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে শেখ মুজিবের ইসলামি সম্মেলনে যোগদানের প্রশ্নে মতভেদ সৃষ্টি হয়।
তাজউদ্দীন এই সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল: বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তাই ইসলামি সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগদানের যৌক্তিকতা নেই। তাছাড়া ইসলামি সম্মেলনে যোগদানকারী প্রায় সব দেশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তাই এই সম্মেলনে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। তাজউদ্দীন আরও বলেন যে, ‘এ সময়ে বাংলাদেশ লাহোরে ইসলামি সম্মেলনে যোগ দিলে আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ ভারত অসন্তুষ্ট হবে। সুতরাং বাংলাদেশের উচিত এ সম্মেলনে না যাওয়া।’
কিন্তু শেখ মুজিব তাঁর এসব যুক্তি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। তাই যা কিছুই ঘটে থাকুক, বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে থাকা উচিত হবে না। যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তারা যদি আজ বাংলাদেশকে স্বীকার করে নেয়, তাহলে বাস্তবতার কারণেই আমাদের মুখ ফিরিয়ে থাকা উচিত হবে না। আর ভারত অসন্তুষ্ট হবে, সেই ভয়েই যদি নিজেদের ইচ্ছায় লাহোর সম্মেলনে যেতে না পারি তাহলে আমাদের স্বাধীনতার মূল্য কী? অন্যের ইচ্ছা—অনিচ্ছায় নয়, আমাদের চলতে হবে স্বাধীনভাবে আমাদের ভালো—মন্দ বিবেচনা করে। আর তাই লাহোর সম্মেলনে আমাদের যেতেই হবে ।
আরেকটি ঘটনাও আমাদের তাজউদ্দীন আহমদের সে সময়কার রাজনৈতিক মানস বুঝতে সাহায্য করবে, জয়দেবপুরের কাছে ভাওয়াল বদরে আলম কলেজের নবনির্বাচিত ছাত্রসংসদের অভিষেক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। উল্লেখ্য, বদরে আলম কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’পন্থি গ্রুপটি জয়ী হয়েছিল ।
প্রধান অতিথির ভাষণে তাজউদ্দীন বলেন: আমাদের রাষ্ট্রনীতির চারস্তম্ভÑগণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। একটিকে অপরটির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে যদি দেখা যায় যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে গণতন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলে গণতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলা হবে ।
যাঁরা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, তাঁরা প্রকৃত সমাজতন্ত্রের কথাই বলেন—অবাস্তব সমাজতন্ত্রের কথা নয়।
তাজউদ্দীন আহমদ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রতি তাঁর বিশেষ মনোযোগ, এমনকি সমর্থনও ছিল।
নিজ এলাকা কাপাসিয়ায় আরেক জনসভায় তাজউদ্দীন আহমদ বলেন যে, ছাত্র ও যুবসমাজের উচিত দুষ্কৃতকারীদের দমন করা। কেননা, এরা অসামাজিক কার্যকলাপের দ্বারা সমাজকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এখানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বক্তৃতাকালে মন্ত্রী বলেন, মুক্তিবাহিনীর এক শ্রেণির লোকও বর্তমানে ছিনতাই ও ডাকাতিতে লিপ্ত। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত সশস্ত্র ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছাত্র ও ভুয়া মুক্তিবাহিনী। তিনি এ ধরনের ছাত্রদের নির্মূল করার জন্য ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানান। কেননা, এরা ছাত্রসমাজের কলঙ্ক। পথভ্রষ্ট ছাত্রদের সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড রোধ করার জন্য তিনি ছাত্রদের উপদেশ দেন। আরও বলেন যে একটি বিশেষ শক্তি দেশে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুনাম নষ্ট করতে চায়।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। খাদ্যপণ্যের দাম চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে সেই সঙ্গে চলছে ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎ ও দুর্নীতি। এসব খারাপ কাজের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই যুক্ত। কিন্তু সরকার যেকোনো মূল্যে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে সমাজতান্ত্রিক ধারায়।
বাকশাল ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দেই আমরা: রাজনৈতিক আলোচনায় ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটির ব্যবহার যতখানি সরল, আদতে তার সামাজিক—রাজনৈতিক—সাংস্কৃতিক—অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিন্যাস কিংবা সংজ্ঞা ও সংশয় ততখানি সরল নয়। খানিকটা তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়Ñইউরোপের মতো বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও একটি দ্বন্দ্বমুখর ও ক্রমবিকাশমান ইতিহাস আছে; কিন্তু সেটা ইউরোপের মতো নয়। সেটা বাংলার মধ্যবিত্ত বলেই তার রূপান্তরের সূত্রটি আলাদা, ভাষান্তরের অভিধানটি স্বতন্ত্র। আমার অনুসন্ধান মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারার একটি চূড়ান্ত রূপ আমরা পাই দেশ স্বাধীন হওয়াার পর এবং এ ক্ষেত্রে বাকশালই ছিল তাঁর বিশ্বস্ত প্রকাশমাধ্যম।
স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে যে সমস্যাগুলো ছিল তা নিরসনে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল সরকারকে। যা বিস্তারিত বর্ণনা করা এখানে সম্ভব হচ্ছে না। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনর্গঠনের আরেকটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৯৭২ সালের ভয়াবহ খরায় যেমন আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল তেমনি ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে উপকূলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনা অঞ্চল প্রবল জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হলে প্রায় ১৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছিল।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বন্যার কবলে পড়েছিল দু’বার। প্রথমবারের আকস্মিক বন্যায় সিলেটে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বন্যার ঢলে দেশের প্রধান বোরো ধান চাষযোগ্য বিল ও হাওর অঞ্চলের প্রায় দেড় লাখ টন ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। প্রথমবারের ক্ষতি তখনও সামলে উঠতে পারেনি দেশ। জুলাই—আগস্ট মাসে প্রবল বর্ষণ থেকে আবারও শুরু হয়ে গেল বন্যার প্রকোপ। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক—তৃতীয়াংশ ভেসে গিয়েছিল সর্বনাশা বানের জলে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি টন আর বন্যাকবলিত হয়েছিলেন প্রায় ৩ কোটি মানুষ। উত্তরাঞ্চলের কেবল রংপুর জেলাতেই বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ আর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল ৮—১০ হাজার ।
পরিবেশ, পরিস্থিতি, বাস্তবতা আর সময়কে মাথায় রেখে সেদিনের বাংলাদেশ নিয়ে আজকের দিনে ভাবতে বসলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবেÑযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রায় সহায়—সম্বলহীনভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারকে নানা ধরনের সমস্যা একসঙ্গে মোকাবেলা করতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশ পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য তহবিলের সন্ধানে ছিল। এ অবস্থায় ৪ জুলাই পররাষ্ট্র দপ্তর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের দুটি অঙ্গ সংস্থা আইবিআরডি (পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক) ও আইডিএ (আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা)—এর সদস্যপদ পেয়েছে। আইবিআরডির সদস্যপদ পেতে ৮২টি দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন করে। নয়টি দেশ—আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, মালি, মরক্কো, পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও জাম্বিয়া ভোটদানে বিরত থাকে। আইডিএর সদস্য হতে বাংলাদেশকে ৭৫টি দেশ সমর্থন জানায়।
বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক রেজিমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায় । ৭ জুলাই ১৯৭২ তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ সচিবালয়ে উন্নয়ন বাজেট সম্পর্কে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এবং কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহান ও মোশাররফ হোসেন। তাজউদ্দীনের বক্তব্যের সারকথা ছিলÑসম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, আগামী বছর প্রথম জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে এবং ১৯৭২—৭৩ আর্থিক বছর ওই পরিকল্পনার প্রথম বর্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তাজউদ্দীন বলেন, সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকার প্রতিশ্রম্নতি মোতাবেক সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, গত ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ব্যাংক, বীমা ও বৃহদায়তন শিল্প জাতীয়করণ ঘোষণা করে উপরিউক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। অবশ্য তিনি এই জাতীয়করণকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার একটি ক্ষুদ্র অংশ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এর বৃহত্তর অংশ গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল।
সংবাদ সম্মেলনে তাজউদ্দীনের ভাষণের বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করা হলো : গত বছর দখলদার পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের যে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছিল, ইতিহাসে তার তুলনা নেই। সেই বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের কাজ আমরা সবেমাত্র শুরু করেছি। এ জন্য আমাদের আগামী বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও আমাদের সীমিত সম্পদকে যথাসম্ভব পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ।
এ কথাও অনস্বীকার্য যে সর্বপ্রকার শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের আপসহীন সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল। তাই স্বাধীনতালাভের পর জীবনযাত্রার উন্নততর মান অর্জনের জন্য জনগণের স্বাভাবিক আশা—আকাক্সক্ষা বিশেষভাবে জাগ্রত হয়েছে। তাই আজ এক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার আওতায় জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং সেই উদ্দেশ্যে পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জাতীয় কর্মসূচিকে সফল করে তোলার বিরাট দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের ওপর অর্পিত হয়েছে।
এই দ্বিবিধ লক্ষ্যের বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান পরিকল্পনায় যেসব (বিলের) ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় তা ন্যূনতম। যে প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের অভীপ্সিত সামাজিক বিপ্লব সাধন করতে হবে, দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই প্রশাসনযন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছিল এক ঔপনিবেশিক সরকারের প্রয়োজনে। গণবিরোধী সরকারসমূহের অভিপ্রায় সিদ্ধির জন্য প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করা হতো, এখন তাকে একটি বৈপ্লবিক সমাজব্যবস্থায় জনগণের সেবায় নিয়োজিত করতে হবে। এই অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাঁরা চলতে পারবেন না, তাঁদেরকে পশ্চাতে ফেলেই জনগণের জয়যাত্রা অব্যাহত গতিতে অগ্রসর হবে।
সমাজবিপ্লবের পথ সুগম করতে হলে সরকারের রাজনৈতিক কর্মীদের পক্ষে যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। সমাজবিপ্লব সাধনে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারের দায়িত্ব পালন করতে হলে সকল শ্রেণির কর্মীকে বুলি সর্বস্বতা ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করে দেশের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে । সমাজতন্ত্রে উত্তরণের এই সূচনাকালে অপেক্ষাকৃত বিত্তবানদের দেশের জনগণের দারিদ্র্য মোচনের জন্য আবশ্যকীয় সম্পদ সৃষ্টিতে অংশ নিতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে দরিদ্র জনগণের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগের উপযোগী উদ্বৃত্ত তহবিল গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের সুদক্ষ পরিচালনার ব্যবস্থা অবশ্যকরণীয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার শিল্প পরিচালনার আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে সাহায্য করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের সর্বোৎকৃষ্ট পরিচালন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত থেকে আমরা সাহায্য গ্রহণ করব। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালকদের দায়িত্বজ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পরিচালন—প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মালিক ও শ্রমিকের চিরন্তন বিরোধ দূর করার জন্য আমরা পরিচালন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পক্ষপাতী। ৭ জুনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শিল্পক্ষেত্রে পরিচালকমণ্ডলীতে দুজন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকার ব্যবস্থা করা এবং ওয়ার্কস কমিটিতেও শ্রমিকদের অনুরূপ প্রতিনিধিত্বের কথা ঘোষণা করেছেন। উৎপাদন বৃদ্ধিতে শ্রমিকদের উৎসাহিত করার জন্য যাতে তারা কষ্টার্জিত উৎপাদনের অংশ লাভ করতে পারে, আমরা তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে চাই। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনে কোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়, এমনকি কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশি অগ্রসর। মুক্তিসংগ্রামে শ্রমিক ভাইয়েরা যে ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, বর্তমান দেশ গড়ার সংগ্রামেও তাঁরা তেমনি সংকল্প নিয়ে অগ্রসর হবেনÑএ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কৃষিক্ষেত্রেও শ্রমিক ও মালিকের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে হবে এবং জমির মালিকানা প্রকৃত কৃষককে দিতে হবে। কৃষক ভাইয়েরা সমবায়ের মাধ্যমে কৃষির উৎকর্ষ সাধন করবেন। উপরিউক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সার্বিক ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে। উন্নয়ন কৌশলের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ও জনসম্পদের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর এবং সার্বিক পুনর্গঠন। উৎপাদনসীমা এখনো স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ববর্তী সীমার নিচে রয়েছে।
বাকশালের পূর্ব প্রস্তুতি তাজউদ্দীন আহমদের বাজেট পরবর্তী অর্থনৈতিক কাঠামোতে আলোকপাত করলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো বাকশাল তাত্ত্বিকভাবে তৈরি হচ্ছে। তখন দেশের রাজনীতি দিন দিন হয়ে পড়ছিল সংঘাতময়। ‘গণতান্ত্রিক সংসদীয়’ ধারার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হচ্ছিল ‘সশস্ত্র বিপ্লবী’ ধারা। ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ বন্যা এবং তার পরে দেখা দেয় চরম খাদ্যসংকট। খাদ্যপণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। মানুষ না খেয়ে মরতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়।
মন্ত্রিসভার রদবদল সাধারণ ঘটনা। ১৯৭৪ সালের মে মাসে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী—প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়েন। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর টক অব দ্য টাউন ছিল অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ। মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দীনের বিদায় নিয়ে অনেক আলোচনা ও গুঞ্জন ছিল। এর পেছনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল বলে কেউ কেউ মনে করে। অন্যদিকে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়ছিল বলেও মনে করা হয়ে থাকে। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক যেহেতু খন্দকার মোশতাকসহ আরও অনেকেই তার বিরুদ্ধে ছিল।
যে কারণেই হোক তাজউদ্দীন আহমদ তখন আর মন্ত্রিসভার সদস্য নন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তার কথা হচ্ছে দেখা হচ্ছে মিটিং হচ্ছে। দলের সকল মিটিং এ অংশগ্রহণ করছেন। তবে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পর তাজউদ্দীন আহমদের সিরাজুল আলম খানের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সাথে বাম দলগুলোর ক্ষেত্রেও। এর পূর্বে যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো গণ—ঐক্যজোটের আলোচনা।
এই গণ—ঐক্যজোট সংক্রান্ত আলোচনাটি শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে। জোটের যুক্ত বিবৃতিও প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে। এই গণ—ঐক্যজোট গঠনের উদ্যোক্তা হিসেবে তৎকালীন সংবাদপত্রে আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ করে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয় সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ এর নাম ছিল। গণ—ঐক্যজোটের উদ্যোক্তাদের আলোচনাটি থেকেই বাকশাল সম্পর্কিত অনেক তথ্যসূত্র পাওয়া যায়।
আবার অনেক গবেষক মনে করে থাকেন, বাকশাল আসলে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল না। এমনকি আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে এখনো সম্পৃক্ত রয়েছেন তাদের একটা বড় অংশ মনে করেন বাকশাল ধারণাটি মূলত বামপন্থিদের। সিরাজুল আলম খান পরোক্ষভাবে এটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল এমন একটি জোট গঠিত হোক এবং সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছিল সিপিবি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর বইয়ে ন্যাপকে (মোজাফফর) আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’ সিপিবিকে গণ—ঐক্যজোটের উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বক্তব্যগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছে যে, বাকশাল কার্যত বামপন্থিদের উদ্যোগ। আবার বামপন্থিদের আরেকটি অংশ বাকশালের তাত্ত্বিক ক্রেডিট নিতে চান, তারা বলেন বাকশাল তত্ত্বটি তাদের কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
আগেই বলেছিলাম গণ—ঐক্যজোটের উদ্যোক্তা কারা সেই আলোচনাটিই গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। পৃথিবীর নানা রাজনৈতিক মতবাদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ নিঃসন্দেহে অবগত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাজউদ্দীন আহমদের রসায়নটা ঠিক এই জায়গাতেই ঐক্যবন্ধনের আভাস দেয়। যেটা তাজউদ্দীন আহমদ জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। বাকশাল ব্যবস্থা নিয়ে মূলত তাজউদ্দীন আহমদ সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করেছেন বাস্তবায়নের জন্য বাকশাল নিয়ে মতপার্থক্য ছিল না। তবে বাকশালের একটা বিরাট অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজের উদ্ভাবিত, এটার প্রমাণ পাওয়া যায়, মুক্তিযোদ্ধা ও সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের এক সাক্ষাৎকারে। তাঁর সাক্ষাৎকারের একটি অংশে তিনি বলেন, ‘অনেক রকম চিন্তাই তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) কাছে ছিল। অনেকের কথাও তিনি শুনেছিলেন, শোনা মানে এগ্রি করা নয়। কিন্তু বাকশালের প্রশ্নে হি পিক্ক্ড আপ দ্য আইডিয়া, যেটার একটি বড়ো অংশ তাঁর নিজের উদ্ভাবিত।’
১৯৭৫ সালের ১৭ জানুয়ারি গণভবনে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠক শুরু হয়। দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরাও এই বৈঠকে যোগ দেন। শেখ মুজিব বিরাজমান পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে সমস্ত ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করেন। পরপর তিন দিন সাত ঘণ্টার তীব্র বাদানুবাদের মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হয়।
বৈঠকে দলের নেতারা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবটি মেনে নেন। তাজউদ্দীন আহমদ এই বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ও সমর্থন করেন মৌলিক পরিবর্তন কাঠামো নীতিতে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল ২৯৪—০ ভোটে পাস হয়।
সাপ্তাহিক একতার সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বাকশালব্যবস্থা বিল পাস হওয়ার পর সংসদ শেষে, তাজউদ্দীন আহমদের কাঁধে হাত রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বেরিয়ে গেলেন।’ নিশ্চিত নির্ভরতার প্রতীক, সেই বিশ্বস্ত কাঁধ!
তথ্যসূত্র
১। মহিউদ্দিন আহমদ, তাজউদ্দীন নামে একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
২। মারুফ রসুল, বাকশালের আদ্যোপান্ত: প্রথম খণ্ড, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৩। সুভাষ সিংহ রায়, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব ও বাকশাল, সময় প্রকাশন, ঢাকা।
৪। মহিউদ্দিন আহমদ, মওলানার রাজনীতি, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
৫। মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, এবং বঙ্গবন্ধুর বাকশাল, অগ্রদূত প্রকাশন, ঢাকা।
৬। আনোয়ার উল আলম, রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা।
৭। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ বিতর্ক: ১৯৭৫ (প্রথম খণ্ড), বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়, ঢাকা।
৮। শেখ আবদুল আজিজ, রাজনীতির সেকাল ও একাল, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

