২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের শাসনকাল শেষ হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ কমতে থাকে। কিন্তু এই মন্দার মধ্যেই চীন নতুন করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কতটা সহায়তা করতে পারে, আর কতটা ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত অন্তত তিনটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে হান্ডা নামের একটি প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস উৎপাদনে, খিয়াশি নামের আরেকটি কোম্পানি আন্ডারগার্মেন্টস উৎপাদনে এবং লেসো নামের একটি প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে।
বিডার হিসাব অনুযায়ী, এই বিনিয়োগে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিনিয়োগ পোশাক ও টেক্সটাইল খাতেই সীমাবদ্ধ, যেখানে বাংলাদেশের বাজার ইতোমধ্যেই প্রতিযোগিতামূলক ও পরিপূর্ণ।
চীনের ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ফিলিপাইনে বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসা বিনিয়োগের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাই এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছেন। লেসোর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আগ্রহকে অবশ্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ মনে করেন, এই বিনিয়োগ আকারে ছোট এবং স্বল্পমেয়াদী। তার মতে, চীন কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এখানে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। চীনের আঞ্চলিক বিনিয়োগ কৌশল বাংলাদেশেও প্রয়োগ হচ্ছে, এবং এটি ভূরাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, গার্মেন্টস খাতে চীনের বিনিয়োগ একদিকে কর্মসংস্থান বাড়াবে, কিন্তু অন্যদিকে শিল্পের বহুমুখিতা কমিয়ে দিতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর ও হাইটেক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসা এখন সবচেয়ে জরুরি।
চীন যখন বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ শুরু করেছে, তখনই হাসিনা পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা নিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে ভিসা প্রদানে কঠোরতা এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কার্যক্রমে কূটনৈতিক অসহিষ্ণুতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় চীনের সক্রিয় ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনকার চীনা বিনিয়োগ কিছু কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারবে ঠিকই, তবে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন শৃঙ্খল তৈরিতে এটি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে খনিজ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও হাইটেক খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।
দ্বিধা রয়ে গেছে—চীনের এই নতুন উদ্যোগ কি বাংলাদেশের জন্য শুধু অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ, নাকি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি গড়ে দেবে।

