বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের স্থান বিশেষ। ভাষা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান—যে কোনো সময়ে তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠই দেশের মনের প্রতিফলন। কোটা আন্দোলন সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন তখনকার ছাত্র সমাজকে রাস্তায় নামিয়ে আনে ন্যায্য দাবির পক্ষে। রাজপথ তখন শ্লোগান, মানববন্ধন, সমাবেশে মুখরিত। তরুণদের চোখে ঝিলিকানি স্বপ্নের আলো, মনে অদম্য চেতনা। কিন্তু সরকার সেই আগুনকে নিভিয়ে দিতে শক্ত হাতে হস্তক্ষেপ করে। শিখা চাপা পড়ে গেল, কিন্তু নিভে যায়নি।
ভেতরে ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে সেই আগুন। ছাত্র-জনতার জমে থাকা ক্ষোভ, অন্যায়ের প্রতি আক্রোশ, এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ধোঁয়া কখনো নিভে যায় না। ২০২৪ সালে যখন নতুন প্রজন্মের ছাত্ররা আবার রাস্তায় নামলো, তখন গোটা দেশ যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। রাজপথ মুখরিত হলো স্লোগানে, তরুণদের চোখে ভেসে উঠলো সমান সুযোগের স্বপ্ন। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারলো—এবার হয়তো পরিবর্তনের ঝড় আসছে।
আন্দোলনের গতি তখন প্রবল, যেন নদীর স্রোত উছাল দিয়ে এগোচ্ছে। প্রাণের তাজা রক্ত ঢেলে ছাত্ররা জানিয়ে দিল—তারা অন্যায় মেনে নেবে না। মৃত্যু, গ্রেপ্তার, নিপীড়ন—কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি প্রাণহানিই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে, মানুষের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জাগিয়েছে। সামরিক বাহিনী মাঠে থাকলেও জনগণ বুঝতে পারছিল—তাদের নীরব সমর্থন জনগণের দিকেই। যদিও সরাসরি হস্তক্ষেপ হয়নি, তবুও আন্দোলনের শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেল। সরকারের পদক্ষেপ ধীরে ধীরে আংশিক দমনে পরিণত হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষের চেতনা ও সংহতি আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আন্দোলনের স্রোত তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছিল, সরকার কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে।
কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু জায়গায় আগুন ম্লান হতে শুরু করে। কারণ ছিল একাধিক। আন্দোলনের নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কখনো সিদ্ধান্তহীনতা, কখনো একলা চলো নীতি—সব মিলিয়ে আন্দোলনের অভ্যন্তর ভাঙতে থাকে। সাধারণ ছাত্ররা হতাশ হতে শুরু করে। তারা দেখলো—যে আন্দোলনের জন্য সহপাঠীরা প্রাণ দিয়েছিল, সেই আন্দোলন এখন দিকনির্দেশনা হারাচ্ছে। অনিশ্চয়তার আবরণ রাজপথে নেমে আসে, আগের তীব্রতা নদীর মতো ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে।
মানুষ বুঝতে পারে, একটি আন্দোলন শুধু আবেগে টিকে থাকে না। প্রয়োজন সুসংগঠিত নেতৃত্ব, দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। কোটা আন্দোলনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। আগুন ছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তে, কিন্তু বিভক্তি ও অনিশ্চয়তা সেই আগুনকে নিভিয়ে দেয়।
তবু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—ন্যায়ের লড়াই চিরকাল নিভে যায় না। আজ ছাত্র-জনতা হতাশ, আজ আগুন ছাইয়ের নিচে চাপা, কিন্তু সেই ছাইয়ের ভেতর আগুন আবার জ্বলতে পারে। ক্ষোভ জমে থাকা প্রজন্ম একদিন আবার বিস্ফোরিত হবেই। প্রশ্ন শুধু একটাই—তারা কি এবার বিভক্তির ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি আবারো হতাশার গহ্বরে হারিয়ে যাবে?
কোটা আন্দোলন আমাদের সামনে এক দ্বিমুখী সত্য দাঁড় করায়। একদিকে এটি ছিল জাগরণের প্রতীক—যা দেখিয়েছে, তরুণরাই যখন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তখন রাজপথ কাঁপে, স্লোগান দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সরকার কেঁপে ওঠে। অন্যদিকে এটি শিখিয়েছে—আন্দোলন ধরে রাখতে হলে নেতৃত্ব ও ঐক্য অপরিহার্য। জাতির সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এবং লক্ষ্যকে নির্ধারিত রাখা ছাড়া কোনো আন্দোলন স্থায়ী হতে পারে না।
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন দমন করা হয়েছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলন মানুষকে আবার জাগিয়ে তুলেছিল। যদিও পরবর্তীতে আগুন কিছুটা নিভে গেছে, তবু ছাত্র-জনতার মধ্যে এখনো জেগে আছে নতুন সূচনার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনা প্রমাণ করে—ন্যায়ের লড়াই কখনো শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়, সময় বদলায়, এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করে।
কোটা আন্দোলন তাই এক শিক্ষা। এটি দেখিয়েছে, যে আগুন একবার জ্বলে উঠলো, তা ছাই হয়ে গেলেও পুনরায় জ্বালিয়ে তোলা সম্ভব। যদি প্রজন্ম শিক্ষা নেয়, ঐক্য বজায় রাখে, আর সাহসের সঙ্গে লড়াই চালায়, তবে আগুন আবারও ছড়িয়ে দিতে পারে আলো—শিক্ষা, ন্যায্যতা, সমতার আলো। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের চেতনা যদি জাগ্রত থাকে, তবে কোনো নিপীড়ন, কোনো দমননীতি তাকে নিভিয়ে দিতে পারে না। ঝড়ের মতো বাধা, নদীর মতো বিপদ, অন্ধকারের চাপ—সবকিছুই তখন শুধু আগুনকে আরও তীব্র করে, আরও উজ্জ্বল আলো ছড়ায়। ছাইয়ের ভেতর লুকানো সেই আগুন একদিন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আবার দেশকে জাগিয়ে তুলবে, আবারো নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন শক্তির স্রোত বয়ে আনবে। এবং সেই আগুন, যেটি একবার নিভে গেছে বলে মনে হয়েছিল, সেই আগুনই ভবিষ্যতের পথে আলো দেখাবে, ঝড়ের বাঁধা কাটিয়ে দেশকে নতুন রূপে জাগিয়ে তুলবে। কারণ সত্যিকার ন্যায়ের লড়াই কখনো নিভে যায় না—শুধু অপেক্ষা করে ফিরে আসার জন্য।

খসরু খান
লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

