শত কোটি মানুষের পাতে প্রতিদিনের সঙ্গী আলু, সহজলভ্য ও সুস্বাদু হলেও, এই সবজিটির প্রকৃত উৎস নিয়ে বহুদিন ধরে ছিল বৈজ্ঞানিক ধোঁয়াশা। তবে এবার বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই রহস্যের জট খুলে গেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৯০ লাখ বছর আগে আন্দিজ পর্বতমালার গঠনের সময় এক প্রাকৃতিক জেনেটিক মিশ্রণের মধ্য দিয়ে আলুর উদ্ভব ঘটে। এটি ঘটে এক প্রাচীন টমেটো জাতের গাছ এবং এক ধরনের টিউবারবিহীন (কন্দবিহীন) আলু সদৃশ উদ্ভিদের মধ্যে আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে। সেই হাইব্রিড থেকেই প্রথম টিউবার বা কন্দের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে আলু পরিবারের সব বন্য ও চাষযোগ্য প্রজাতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞান সাময়িকী Cell-এ ৩১ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, এই ক্রস-বংশধারাই জন্ম দিয়েছে ১৮০টিরও বেশি বন্য প্রজাতি এবং হাজার হাজার চাষযোগ্য আলুর জাতের।
বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো Solanum tuberosum, অর্থাৎ চাষযোগ্য আলু। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, আলুর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার একটি বিশেষ উদ্ভিদ Solanum etuberosum-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এদের দেখতে আলুর মতো হলেও এরা টিউবার তৈরি করতে পারে না। পাশাপাশি আলুর সঙ্গে টমেটোরও ঘনিষ্ঠ জিনগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে আগে ধারণা ছিল, এরা কেবল দূর সম্পর্কের আত্মীয় মাত্র।
এবার গবেষকরা জেনেটিক বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এ দুটি উদ্ভিদের মধ্যে সরাসরি আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমেই আলু বংশধারার উৎপত্তি। তারা চাষযোগ্য আলুর বিভিন্ন জাত এবং এর বুনো আত্মীয়দের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেন, সব আলু প্রজাতির জিনগত গঠন প্রায় সমানভাবে দুটি উৎস থেকে এসেছে—অর্ধেক টমেটো জাত থেকে, বাকি অর্ধেক S. etuberosum থেকে।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যান্ড্রা ন্যাপ বলেন, “এই একবারের আন্তঃপ্রজনন থেকেই এমন একটি জেনেটিক সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছিল, যা টিউবার গঠনের সক্ষমতা এনে দেয়।”
গবেষণায় দেখা গেছে, SP6A নামের একটি জিন, যেটি টিউবার গঠনের নিয়ন্ত্রণকারী ‘মাস্টার সুইচ’, এসেছে টমেটো উৎস থেকে। আর IT1 নামের একটি জিন, যেটি মাটির নিচের কান্ড বা স্টোলন বৃদ্ধির জন্য জরুরি, সেটি এসেছে S. etuberosum থেকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, IT1 না থাকলে টিউবার খুব ছোট হয়, আর SP6A না থাকলে টিউবার গঠিতই হয় না।
তবে স্পেনের বার্সেলোনায় Centre for Research in Agricultural Genomics-এর উদ্ভিদবিজ্ঞানী সালোমে প্র্যাট, যিনি এই গবেষণায় অংশ নেননি, বলেন, “এই দুই জিনের উত্তরাধিকার প্রমাণ করা হলেও, তা থেকেই সঙ্গে সঙ্গে টিউবার তৈরি শুরু হয়েছিল, এমনটা বলা কঠিন। বিষয়টি আরও জটিল।”
তবুও গবেষকরা বলছেন, আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে একেবারে নতুন ও জটিল অঙ্গ গঠনের যে ক্ষমতা আলুতে দেখা গেছে, তা উদ্ভব ও বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। যদিও অধিকাংশ হাইব্রিড উদ্ভিদ জেনেটিক জটিলতায় বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়, তবে টিউবার মাটির নিচে থেকে পানি ও পুষ্টি ধরে রেখে নতুন গাছ জন্মাতে পারে—বীজ ও পরাগায়নের দরকার হয় না। এই জৈববৈশিষ্ট্য হয়তো আলুকে অতীতের কঠিন আবহাওয়ায় টিকে থাকার বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।
আন্দিজ পর্বতমালার উদীয়মান নতুন আবাসস্থলগুলো আলুর বিস্ময়কর বৈচিত্র্য তৈরি করে দেয়। গবেষকরা বলছেন, আলু তার পূর্বপুরুষদের মতো নয়—যেখানে টমেটো গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ভালো বোধ করে, আর S. etuberosum ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জন্মে—আলু পেয়েছে উভয়ের গুণাবলির সমন্বয়, যা তাকে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
যদিও বর্তমানে বিদ্যমান ১৮০টি বন্য আলু প্রজাতির বেশিরভাগই তিক্ততা বা বিষাক্ততার কারণে খাওয়ার অযোগ্য, তবে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসীরা একটি খাওয়ার উপযোগী বন্য প্রজাতি আবিষ্কার করেন এবং সেখান থেকে বহু চাষযোগ্য জাত তৈরি করেন। স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা পরবর্তীতে এই জাতগুলো ইউরোপে নিয়ে আসেন, যা বিশ্বব্যাপী আলুর বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
তবে আধুনিক কৃষিতে অধিক উৎপাদনশীলতা বা রোগ প্রতিরোধের জন্য একতরফা বাছাইয়ের কারণে চাষযোগ্য আলুর জিনগত বৈচিত্র্য অনেকটা হারিয়ে গেছে। ফলে বর্তমান জাতগুলো জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত গরম কিংবা আবহাওয়ার চরমতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গবেষকরা বলছেন, এখন যেহেতু আলুর উৎসস্থল দুই পূর্বপুরুষ উদ্ভিদের জিনগত অবদান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে, তাই ভবিষ্যতের গবেষণায় হারিয়ে যাওয়া উপকারী বৈশিষ্ট্যগুলো পুনরুদ্ধার করে নতুনভাবে চাষযোগ্য, টেকসই ও অভিযোজিত আলু তৈরি সম্ভব হবে, হোক তা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বা প্রথাগত বংশবিস্তারে।

