সিলেটে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয় জন মানুষের একসঙ্গে প্রাণ গেল। একই দিনে বগুড়ায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের ওপর উঠে গেল একটি বাস, নিহত হলেন সাত শ্রমিক। সড়ক দুর্ঘটনায় এরকম মৃত্যুর খবর আমাদের প্রতিদিনই শুনতে হয়, দেখতে হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনার সাক্ষ্য দিচ্ছে, বাংলাদেশের সড়কে মানুষের জীবনের দাম প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। একটি দুর্ঘটনার খবর আসে, কিছু ছবি ছাপা হয়, স্বজনদের আহাজারি দেখা যায়, একটি তদন্ত কমিটি হয়, চালক গ্রেপ্তার হন। তারপর সব চুপচাপ। নতুন আরেকটি দুর্ঘটনা এসে পুরোনোটিকে মুছে দেয়। এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা এখন আমাদের জীবনে অস্বাভাবিক এক স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের ভাবা উচিত, এত দুর্ঘটনা ঘটার পরও আমরা কেন একটি কার্যকর নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি না?
এই মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?
গত দুই দশকে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামোয় যে যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরে চার লেন, কোথাও ছয় লেনের সড়ক হয়েছে; সেতু হয়েছে, উড়ালসড়ক হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে, টানেল হয়েছে। পুরোনো সরু সড়কের জায়গায় এসেছে প্রশস্ত মহাসড়ক। রাস্তায় নামি-দামি গাড়ি নেমেছে। ১৫ বছর আগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ আন্তঃজেলা রুটে গুটিকয়েক কোম্পানির সীমিত কিছু এসি বাস চলাচল করতো। এখন হাজারের উপর এসি বাস তো চলছেই, পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ব্রান্ডের ডাবল ডেকার, স্লিপার কোচ চলছে কয়েকশত। ভালো বাস নামলো, রাস্তা প্রশস্ত হলো, ফুটওভারব্রিজ হলো, ফ্লাইওভার হলো, আন্ডারপাস হলো- সড়কে মানুষের নিরাপত্তা কতটুকু বাড়লো?
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনা ছিল ৬ হাজার ৩৫৯টি, নিহত ৮ হাজার ৫৪৩ জন এবং আহত ১২ হাজার ৬০৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ, প্রাণহানি ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
আরও কয়েক বছর পেছনে গেলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত ও ১০ হাজার ৩৭২ জন আহত হন। ২০২১ সালে ৫ হাজার ৬২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭ হাজার ৮০৯ জন। ২০২০ সালে ৪ হাজার ৮৯১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬ হাজার ৬৮৬ জন। ২০২০ থেকে ২০২৫ এই ছয় বছরে যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবেই সড়কে প্রাণ গেছে প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০ মানুষের। আহত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। এদের একটি অংশ হয়তো চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। কিন্তু একটি অংশ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। আর প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে পরিবার,অনেকের ভবিষ্যৎ এবং অনেকগুলো স্বপ্ন দুমড়েমুচড়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি মূলত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে হিসাব তৈরি করে। অন্যদিকে সরকারি তথ্যের পরিধি ও সংজ্ঞা ভিন্ন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবও অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আরও অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বাংলাদেশ প্রোফাইল অনুযায়ী ২০২১ সালে সরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যুর বিপরীতে সংস্থাটির অনুমিত মৃত্যু ৩১ হাজার ৫৭৮; প্রতি লাখ জনসংখ্যায় অনুমিত মৃত্যুহার ১৮ দশমিক ৬। এই পার্থক্য আমাদের বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও দপ্তরের হিসেবের দুর্বলতা তুলে ধরছে। আমরা আসলে কত মানুষ সড়কে হারাচ্ছি তার একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ পাচ্ছি না। মৃত্যুর হিসেবে বড় গড়বড় থাকায় নীতিনির্ধারণ যথাযথ তথ্যনির্ভর হচ্ছে না।
তবে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা গভীর সংকট নিয়ে কোনো পরিসংখ্যানেরই দ্বিমত নেই। অনেকে এই সংকটকে কেবল ‘চালকদের দোষ’ বলে মূল সমস্যার আড়াল করে। চালকরা ভুল করেন। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করেন। ঘুমিয়ে পড়েন। কখনো মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। মোবাইল ব্যবহার করেন। এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ চালকদের পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ না থাকা। একজন ক্লান্ত মানুষকে যদি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসিয়ে রাখা হয়, তারপর বলা হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়েক শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার দায় শুধু ওই মানুষের ওপর চাপানো কি ন্যায়সংগত? অজ্ঞতা, অভাব বা মালিকের চাপ থেকে অনেক বাস-ট্রাক-লরির চালক আইন অমান্য করে টানা ১২, ১৪ কিংবা ১৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান। আইনে নিষেধ থাকলেও মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নাই। অথচ চালকদের কর্মঘন্টা তদারকি করা অসম্ভব কিছু নয়। পরিবহণ মালিক ও মালিক সমিতিকে নির্দেশ দিলে তারা আইন মানতে বাধ্য। তাছাড়া গাড়ি চালকদের ডিজিটাল লগবুকের ব্যবস্থা করে কর্মঘন্টা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
চালকের জীবনমান সড়ক নিরাপত্তার অংশ। গাড়ি চালকদের যেমন অনেক দায় আছে, চালকদের জীবনমান উন্নয়নের দায়দায়িত্বও রাষ্ট্রের। চালকের জীবনমানের সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার গভীর সম্পর্ক আছে, যেটি নিয়ে আমাদের সমাজ, মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কথা হয় না। পরিবহণ শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় নীতিমালা বা নিম্নতম মজুরি বোর্ড না থাকায় মালিক ও শ্রমিকদের সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে অধিকাংশ শ্রমিক নির্দিষ্ট চুক্তিপত্র বা আইনি সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করেন। একজন বাসচালকের আয় যেমন সীমিত, তেমনি অনির্ধারিত। নো ওয়ার্ক নো পে নীতিতে তাদের জীবন চলে। তাঁর ওপর থাকে নানা ধরনের খরচ ও চাপ। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, মালিকের জমা তোলা, যাত্রী ধরে রাখা, জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব মেলানো- এর সঙ্গে পথে পথে নানা অজুহাতে চাঁদা দিতে হয়। এই চাপ শেষ পর্যন্ত চালকের ওপরই পড়ে। পরিবহণ শ্রমিকদের নিজেদের তৈরি একটি প্রথা নিজেদের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য মরণফাঁদ তৈরি করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস শ্রমিকরা টানা ১৬-২০ ঘন্টা কাজ করে এবং পরবর্তীতে একাধারে এক থেকে দুই দিন বসে থাকে। ফলে প্রতিদিন যে বিশ্রাম তাঁদের প্রয়োজন, তা হয় না; যে সময় পরিবার বা নিজের জন্য বরাদ্দ থাকার কথা, সেটিও চলে যায় রাস্তায়। ট্রাক- লরি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে অনেক সময় টানা ৭ দিন ট্রিপে থাকতে হয়,পরিবার- গৃহ থেকে দূরে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি বা সরকারি গাড়ি চালকদেরও অতিরিক্ত কর্মঘন্টা বা টানা ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করতে হয়, যা দূর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
সড়ক যেন মৃত্যপুরী
একজন মানুষ যখন দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান, ক্লান্তি তাঁর মনোযোগ কমিয়ে দেয়। তার সঙ্গে যদি আর্থিক চাপ, রাস্তায় হয়রানি, ট্রাফিকের চাপ, মালিকের তাগাদা এবং নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যুক্ত হয়, তাহলে মানসিকভাবে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন না। বিরক্তি, উৎকণ্ঠা, ক্ষোভ কিংবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। একজন চালকের হাতে তখন শুধু স্টিয়ারিং থাকে না; তাঁর হাতে থাকে একই সঙ্গে কয়েক ডজন মানুষের জীবন। গাড়ি চালকদের মানসিক চাপকে তাই ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সবার নিরাপত্তার বিষয়। আরেকটি উদ্বেগের বিষয়- কোথাও কোথাও চাঁদা এড়াতে গিয়ে চালককে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে, বিকল্প পথে যেতে কিংবা হঠাৎ গতি বাড়াতে দেখা যায়। এমন অভিযোগ পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে শোনা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাস্তার ওপর হঠাৎ থামিয়ে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা, গাড়ি আটকে রাখা বা তর্ক-বিতর্ক ও হামলার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তখন চালকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব কম থাকে। সামান্য ভুল, সামান্য তাড়াহুড়া কিংবা সামান্য অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। চাঁদাবাজি হলেই দুর্ঘটনা ঘটবে, এমন সরল সম্পর্ক টানা ঠিক হবে না। কিন্তু চাঁদাবাজি যদি চালকের কর্মঘণ্টা বাড়ায়, মানসিক চাপ বাড়ায়, আয় পূরণের জন্য অতিরিক্ত ট্রিপে বাধ্য করে কিংবা রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে, তাহলে সেটি অবশ্যই সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সড়কে বৈধ টোল থাকলে তার নির্দিষ্ট হার, নির্দিষ্ট স্থান ও ডিজিটাল পরিশোধের ব্যবস্থা থাকতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠী যদি সড়কে গাড়ি থামিয়ে অননুমোদিত অর্থ আদায় করে, সেটি শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বিষয়। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি ক্যামেরা, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।
চালককে আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার পর অভিযুক্ত হিসেবে দেখি। অথচ দুর্ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টা তাঁর জীবনে কী ঘটেছে, সেই প্রশ্ন করি না। কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন? কত ঘণ্টা গাড়ি চালিয়েছেন? কতবার থামতে হয়েছে? মালিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ ছিল কি না? রাস্তায় কোনো চাঁদা দিতে হয়েছে কি না? এই প্রশ্নগুলোও দুর্ঘটনা তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। একজন চালককে নিরাপদে গাড়ি চালানোর মতো পরিবেশ তৈরি না করে শুধু তাঁর কাছ থেকে নিরাপদ ড্রাইভিং আশা করা অনেকটা ক্লান্ত মানুষকে কণ্টকাকীর্ণ দৌড় প্রতিযোগিতায় নামিয়ে হোঁচট খাওয়ার জন্য তাকে দোষ দেওয়ার মতো। সড়ক নিরাপত্তা তাই চালকের স্টিয়ারিং- এক্সিলেটর- ব্রেকেই সীমাবদ্ধ নয়; চালকের কর্মপরিবেশ, মজুরি, বিশ্রাম, মানসিক চাপ এবং পথে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাথে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের মহাসড়কে বাস দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ওভারস্পিডিং বা মাত্রারিক্ত গতি। সড়কে গতি নির্ধারক কর্তৃপক্ষ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের গতি নির্ধারণে অবৈজ্ঞানিকতা, অদক্ষতা আছে কোনো কোন জায়গায়। উদাহরণ স্বরূপ ফরিদপুরের ভাঙ্গা ইন্টারসেকশন থেকে খুলনা পর্যন্ত কয়েকটি পয়েন্ট সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। রাস্তার প্রশস্ততা,ঋজুতা, দুর্ঘটনা প্রবণ না হওয়ার কারণে উল্লিখিত গতি স্বাভাবিক মনে হয় না। আবার ঢাকা- ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সকল শ্রেণির গাড়ির জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। ভালো সড়ক ব্যবস্থাপনার দেশগুলোতে মহাসড়কে লেন ভিত্তিক ও যানবাহনের শ্রেণি ভিত্তিক গতি নির্ধারণ করা হয়। গতিদানবীয়তার কথা আসলে বাংলাদেশে প্রতিদিন সহাস্রাধিক উদাহরণ তৈরি হয়। ঢাকা- ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার হলেও কোনো বাসকেই নির্ধারিত গতি মানতে দেখা যায় না। বাসগুলো সাধারণত ১০০-১২০ কিলোমিটার গতিতে চলে। সর্বোচ্চ কৌশলগত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি রাস্তা বলে দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হচ্ছে। তথাপি ২০২০ সালের মার্চ মাসে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে উন্মোচনের পর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সরকারি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৮৪ জন মানুষ মারা গেছেন। এই সময়ে এক্সপ্রেসওয়েটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১,৩০৩টি সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়। ব্রেক ফেইলিউর, কুয়াশার কারণে বা নষ্ট- বিকল গাড়িতে পেছন থেকে ধাক্কায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি হলেও মাত্রাতিরিক্ত গতিই প্রধান অনুঘটক। এই সড়কে সড়কে শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা রোধের জন্য সর্বশেষ প্রযুক্তি ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু রয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড এনফোর্সমেন্ট সিস্টেম এবং ভেহিকেল ডিটেকশন সিস্টেমের (VDS) মাধ্যমে অতিরিক্ত গতিতে চালানো গাড়িগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ট্র্যাক করা যায়। এর ফলে হাইওয়ে পুলিশ সহজেই আইন অমান্যকারী চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তারপরেও অতিরিক্ত গতি ঠেকানো যাচ্ছে না কেন কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।
একটি বাস নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে তার নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে, মালিকের কাছে নোটিশ যাবে, জরিমানা হবে, বারবার অপরাধ করলে রুট পারমিট বা লাইসেন্সের ওপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থাই দরকার। আমাদের জানা নাই অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত কতটি বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইন আছে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের শক্তি প্রয়োগে না হয়ে কাগজে থেকে গেলে সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা কোথায় খুজে দেখা দরকার।
ট্রাফিক পুলিশ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দায়িত্ব এড়াতে পারে না। বিআরটিএর ফিটনেস সনদ দেওয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আছে। খোদ রাজধানী ঢাকাতেই অনেক বাস ছবির খবর বা মিমের বিষয়বস্তু হয়েছে- যেগুলোর ফিটনেস সনদ বিআরটিএ-ই দিয়েছে। বিশেষ করে গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ফিটনেস সনদের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বাসে একই সময়ে কয়েক ডজন, কখনো শতাধিক মানুষ থাকে। একটি ব্যক্তিগত গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি যেখানে কয়েকজনের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, একটি বাসের ত্রুটি সেখানে বহু মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিপন্ন করে। বিদেশি চ্যাসিসের উপর বাংলাদেশের ওয়ার্কশপগুলোতে তৈরি বিলাসবহুল বাসগুলোর মেকানিক্যাল অ্যাকুরেসি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা প্রশংসনীয় হলেও, আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড পুরোপুরি না মানায় চ্যাসিস ও বডির ভারসাম্য নষ্ট হয়। দেশে তৈরি বা সংযোজিত বাসের বডি নির্মাণ, ভারসাম্য, ব্রেকিং সিস্টেম, জরুরি দরজা, আসন বিন্যাস, যাত্রী ধারণক্ষমতা এসবের নিরাপত্তা মান আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা করা দরকার। ডাবল ডেকার বাসের মতো বড় যানবাহনের ক্ষেত্রে তো আরও বেশি। একটি বাসকে রাস্তায় নামার অনুমতি দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্র পরোক্ষভাবে সেই বাসের যাত্রীদের নিরাপত্তার একটি ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিচ্ছে। সেই নিশ্চয়তা ভঙ্গ হলে দায় শুধু চালকের নয়।
অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার, নছিমন-করিমন, লেগুনা এসব এখন দেশের পরিবহণ ব্যবস্থার বড় অংশ দখল করেছে। এগুলোকে রাতারাতি নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এগুলোর সঙ্গে মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে, গ্রাম ও মফস্বলের স্বল্পমূল্যের পরিবহণ ব্যবস্থাও জড়িয়ে আছে। কিন্তু জীবিকা ও নিরাপত্তা দুটির একটিকে বেছে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রাষ্ট্র চাইলে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট গতি, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের মান যাচাই এবং মহাসড়কে চলাচলের বিধিনিষেধের মাধ্যমে এই খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাতে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় মোড়, বাঁক এবং পথচারী-সম্পৃক্ত সংঘর্ষকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্ঘটনার সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত হলেও এই সব অনুমোদনহীন, অবৈজ্ঞানিক ক্ষুদ্র পরিবহণগুলোর দুর্ঘটনায় নিয়মিতই প্রাণহানি হচ্ছে। আবার বাস- ট্রাকের মতো বড় যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সাথেও সংঘর্ষ হচ্ছে এসব ছোট পরিবহণের।
বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের কথা আলাদা করে বলতে গেলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এই যানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটি কম ভয় ও শঙ্কার কথা নয়। মোটরসাইকেল সহজলভ্য হয়েছে, মানুষের চলাচল দ্রুত হয়েছে; কিন্তু নিরাপদ মোটরসাইকেল চালনার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। বাসের মতোই মোটরসাইকে গতিদানব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মোটরসাইকেল সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে ইতোমধ্যে।
আমাদের আবার সাম্প্রতিক সিলেট ও বগুড়ার ঘটনাগুলোর দিকে তাকানো দরকার। অতিরিক্ত গতি এবং চালকের ঘুম বা ভারসাম্যহীনতায় ঝরে গেলো এতোগুলো তাজা প্রাণ। উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন ওঠে গতি, নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও চালকের আচরণ নিয়ে। মহাসড়কের অনেক অংশই খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত সংস্কার, রক্ষানাবেক্ষণের অভাব সহজেই সাধারণ মানুষের গোচরে আসে- কিন্তু চরম দুর্ভোগেও কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না অনেক সময়। ঢাকা- রাজশাহী মহাসড়কের টাঙ্গাইল থেকে নাটোর পর্যন্ত অংশ অনেকদিন ধরেই খানাখন্দে পূর্ণ হয়ে আছে। ভারি বর্ষণ ও খরার কারণে সময়ের সাথে পিচ নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী মাছের ট্রাক থেকে উপচে পড়া পানি- যা রাস্তার পিচ দ্রুত নষ্ট করে। সওজ কর্তৃপক্ষের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোর প্রতিকারে সচেষ্ট হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ২০২০ সালের পর্যবেক্ষণেই দেখা গিয়েছিল, মোট দুর্ঘটনার ৫২ দশমিক ৯৬ শতাংশ ছিল গাড়িচাপার ঘটনা এবং ২২ দশমিক ৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ। সংগঠনটি তখন বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের অদক্ষতা, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ছোট যানবাহনের বিস্তারসহ ১৫টি কারণ চিহ্নিত করেছিল। অথচ ছয় বছর পরও সেই কারণগুলোর অনেকগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে। ব্যর্থতা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই। আমরা সড়ককে দেখি নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে; নিরাপত্তাকে দেখি আলাদা একটি প্রকল্প হিসেবে। অথচ রাস্তা নির্মাণের প্রথম নকশা থেকেই নিরাপত্তা তার অংশ হওয়া উচিত। একটি নতুন মহাসড়ক হলে দেখতে হবে সেখানে পথচারী কোথা দিয়ে রাস্তা পার হবে। বাজারের সামনে গতি কীভাবে কমবে। ছোট রাস্তা থেকে মহাসড়কে ওঠার ব্যবস্থা কেমন হবে। বাস কোথায় থামবে। রাতের আলো কেমন হবে। সড়কের পাশে শ্রমিক বা পথচারীর চলাচল কীভাবে নিরাপদ হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রোফাইলে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামোর জন্য কারিগরি মান, নতুন রাস্তার নিরাপত্তা অডিট এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকার কথা উল্লেখ আছে; কিন্তু সব সড়ককে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মানে উন্নীত করার জাতীয় লক্ষ্য তখন ছিল না। রাস্তা বানানোর পাশাপাশি রাস্তার নিরাপত্তা অডিটকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা দরকার।
এদেশে সড়ক অন্যান্য তদন্তের মতোই সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তের আলোর মুখ কম দেখে। দুর্ঘটনার প্রথম রাষ্ট্রপক্ষীয় প্রত্যক্ষদর্শী সার্জেন্টদের তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের সুযোগ নাই। এতে অনেক আলামত ও ফ্যাক্ট অন্ধকারে থেকে যায়। আমাদের তদন্ত প্রায়ই শুরু হয় চালককে দিয়ে এবং শেষও হয় চালককে দিয়ে। চালক গ্রেপ্তার হলেন, মামলা হলো তারপর রাষ্ট্র যেন দায়মুক্ত। কিন্তু একটি বড় দুর্ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত আরও সম্প্রসারিত।
গাড়ির ফিটনেস, চালকের কর্মঘণ্টা, গাড়ির গতিসীমা, মালিকপক্ষের অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ, সড়কের নকশায় ত্রুটি সর্বাগ্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। স্থানটি দুর্ঘটনা প্রবণ হলে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিয়েছিল তাও আমলে নেওয়া উচিত। এই বিষয়গুলো ছাড়া তদন্ত অসম্পূর্ণ। এই সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষগুলোর উপর বর্তায়। কারণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষগুলোই চালকের লাইসেন্স দেয়,বাসের মালিককে ব্যবসার অনুমতি দেয়,গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করে, রুট পারমিট দেয়, সড়ক রাষ্ট্র নির্মাণ করে, ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দেয়। আইনও রাষ্ট্রই তৈরি করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভুল করলেও মানুষ যাতে প্রাণ না হারায়। আধুনিক সড়ক নিরাপত্তার দর্শন হলো মানুষ ভুল করবে, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয়। বাংলাদেশের এখন ঠিক এই পরিবর্তনটাই দরকার। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর কয়েকদিনের জন্য অভিযান চালিয়ে, কিছু গাড়ি আটক করে, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে, তারপর সব আগের মতো চলতে থাকলে পরিবর্তন আসবে না। সড়ক নিরাপত্তা কোনো ঈদকেন্দ্রিক অভিযান নয়। নিরাপদ সড়ক নাগরিকদের বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির অধিকার।
আমরা উন্নয়ন করেছি। আমাদের রাস্তা আগের চেয়ে অনেকগুন ভালো হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মানুষ কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে। একজন বাবা সকালে কাজে বের হয়ে রাতে সন্তানের কাছে ফিরবেন, একজন মা তাঁর সন্তানকে বাসে তুলে দিয়ে নিশ্চিত থাকবেন যে সে সুস্থভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবে। সড়কে মানুষের জীবনই হতে হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিলেটের ৯ জন যাত্রী কিংবা বগুড়ার ৭ জন দিনমজুরের মৃত্যু তাই শুধ দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়। তারা আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন আর কত মৃত্যুর পর আমরা সিস্টেমে হাত দিব, সত্যিকার সমাধান খুঁজবো। দেশের অগ্রগতি তখনই পূর্নতা পায়, যখন মানুষ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি সুস্থ ও জীবিত বাড়ি ফিরতে পারে। এই দেশে নিরাপদ সড়কের জন্য মানুষের যেন আর আন্দোলন করতে না হয়।