মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্ত করেছে বহুল আলোচিত জুলাই সনদ। রাজনৈতিক দলগুলোর অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গৃহীত এই সনদকে সংবিধানের তপশিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে যুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কমিশন বলেছে, সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

প্রাথমিক খসড়ায় উল্লেখ ছিল, সংবিধান ও আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে জুলাই সনদ এবং আদালতে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। তবে বিএনপিসহ আটটি দল এ প্রস্তাবে আপত্তি জানায়। তাদের মতে, সংবিধানের ঊর্ধ্বে কিছু থাকতে পারে না এবং আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বন্ধ করা হলে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। এ অবস্থানে কমিশন আপত্তিকর ধারা বাদ দেয়। চূড়ান্ত সনদে রাখা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলো সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তুলবে না; বরং আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেবে।

বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কমিশনের বৈঠকে সনদের পটভূমি হিসেবে যুক্ত করা হয় ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২), ছেষট্টির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। তবে আওয়ামী লীগের নাম এড়াতে ছয় দফার পরিবর্তে ১৯৬৬ সালের আন্দোলনকে শুধু স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন বলা হয়েছে। জামায়াতের দাবিতে ২০০৬ সালের সহিংসতাকে “কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড” এবং ধর্মভিত্তিক দলের দাবিতে ২০১৩ সালের ঘটনাকে “নির্মম হত্যাযজ্ঞ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব মোট ৮৪টি সিদ্ধান্তে বিভক্ত করা হয়েছে—৩৪টি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, ২১টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এবং ৯টি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে করা সম্ভব। বাকি ২০টি সংস্কার ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় প্রস্তাবগুলো আগামী সংসদ গঠিত হওয়ার পর সরকারের ওপর ন্যস্ত করতে বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগেই সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের দাবি তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা গণভোটকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান বললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক আদেশকেই সবচেয়ে কার্যকর উপায় মনে করছেন।

কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, “সনদ চূড়ান্ত হয়েছে। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকার ও রাজনৈতিক দলের। কমিশন শুধু বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সুপারিশ দেবে।” তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে একদিনের সংলাপে সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পথনকশা নিয়ে আলোচনা হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আইনি ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রস্তাব এলে বিএনপি আলোচনায় অংশ নেবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগেই পূর্ণ সনদ বাস্তবায়ন চাই।

চূড়ান্ত সনদের সাত দফা অঙ্গীকারে বলা হয়েছে—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে, গণআন্দোলনে নিহতদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন দ্রুত করা হবে।

Share.
Exit mobile version