নিজস্ব প্রতিবেদক:
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকার কারণে এক নারী উদ্যোক্তা ও শিশু উন্নয়নকর্মী প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েছেন। ভুক্তভোগী শরীফা নাহারের অভিযোগ, স্থানীয় একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাকে টার্গেট করে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। চরমনিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি বর্তমানে পরিবারসহ ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
শরীফা নাহার কাশিয়ানী উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে তিনিসামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান “Unique Handicrafts & Boutique” এর মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণদিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তুলছেন। পাশাপাশি তিনি পরিবার পরিকল্পনা, নারীর অধিকার ওবাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।
এছাড়া ঢাকায় অবস্থিত একটি Child Development Center এ তিনি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ওডে–কেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যেখানে শিশুদের আধুনিক শিক্ষা ও নিরাপদপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার এই কর্মকাণ্ডকে এলাকার কিছু উগ্রপন্থীব্যক্তি ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে আসছে। নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থাকে তারা তাদের ধর্মীয় আদর্শের বিরুদ্ধে বলে মনে করছে। এর জের ধরে শরীফা নাহারকে উদ্দেশ্য করে ধারাবাহিকভাবে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ০১৭১১–৬২০৭০৫ নম্বরসহ একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করেকয়েকজন ব্যক্তি নিজেদেরকে মাওলানা রফিকুল ইসলাম–এর নেতৃত্বাধীন একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। ফোনালাপে তারা প্রকাশ্যে উগ্রপন্থী সংগঠনের নামব্যবহার করে তাকে হত্যার হুমকি দেয় এবং তার সামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে চাপ প্রয়োগকরে।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে। শরীফা নাহারেরপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত মরজিনা বেগমের ১৩ বছর বয়সী নাবালিকা কন্যাকে এলাকার ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, মৌলবী হাফিজ খান–এর সঙ্গে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করাহয়। শরীফা নাহার এতে বাধা প্রদান করেন এবং স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের সহায়তায় ওই বাল্যবিবাহ বাতিল করা হয়।
এই ঘটনার পর থেকেই মৌলবী হাফিজ খান প্রকাশ্যে শরীফা নাহারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেপ্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকির ঘটনা ঘটে ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টার দিকে।ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, ০৯৬৯৭০১৬১৫০ নম্বর থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয় তিনি যদি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা ও ইংরেজি মাধ্যমশিক্ষা সংক্রান্ত সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না করেন, তবে তাকে, তাঁর স্বামী এবং তাঁর কন্যাকে হত্যা করা হবে।
এই হুমকির ফলে শরীফা নাহার ও তার পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।যেকোনো সময় সহিংস হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় তারা বর্তমানে স্থায়ীভাবে নিজবাড়িতে অবস্থান করতে পারছেন না।
ভুক্তভোগী জানান, ২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি কাশিয়ানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি(জিডি) দায়ের করেন। তবে জিডি করার পরও অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবংতাকে ও তার পরিবারকে খুঁজতে শুরু করে। প্রাণভয়ে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি নিছক ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং নারীর অধিকার, শিশু সুরক্ষা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কাজ করার কারণে একজন নারী অধিকারকর্মীরবিরুদ্ধে পরিচালিত টার্গেটেড নিপীড়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। অভিযুক্তদের স্থানীয় প্রভাবও সামাজিক ক্ষমতার কারণে ভুক্তভোগীর পক্ষে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শরীফা নাহার বলেন, আমি শুধু নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করেছি। কিন্তুসেই কাজের কারণেই আজ আমার জীবন, আমার স্বামী ও সন্তানের জীবন চরম হুমকির মুখে।

