নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) কার্যালয়ের যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক সংবাদকর্মীকে কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নির্যাতন, মারধর, হুমকি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের পাশাপাশি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, লাইসেন্সসংক্রান্ত অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১ মার্চ বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য তাঁর বক্তব্য জানতে ফোন করেন সংবাদকর্মী আমিনুল ইসলাম। এ সময় কামরুল তাঁকে কার্যালয়ে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার কথা বলেন এবং ২ মার্চ সকাল ১০টার দিকে যেতে বলেন। তবে আমিনুল সেদিন বেলা ১২টার দিকে তাঁর কার্যালয়ে যান।
সেখানে তিনি ‘রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ থাকার বিষয়েও বক্তব্য জানতে চান তিনি।
আমিনুলের অভিযোগ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কামরুল। তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং শার্টের কলার ধরে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। পরে কক্ষের দরজা বন্ধ করে কয়েকজন বহিরাগতকে ডেকে আনা হয়। তাঁরা সেখানে এসে তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে কাগজ কাটার কাঁচি দেখিয়ে তাঁর দুই চোখ তুলে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল ফোনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য কামরুলের ফোনে স্থানান্তর করা হয় বলেও দাবি করেছেন আমিনুল। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন তাঁকে কামরুলের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমিনুল আরও অভিযোগ করেন, জোর করে তাঁর পকেটে একটি খাম ঢুকিয়ে দিয়ে ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করা হয়। গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় জানালে তাঁকে আরও মারধর করা হয় এবং পরে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নে অনিয়ম, অডিট রিপোর্ট নিষ্পত্তিতে অবৈধ লেনদেন এবং ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি।
বন্ড সুবিধার আওতায় রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাতে পারে। তবে এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের জন্য নথিপত্র ও তদন্তের ফল প্রয়োজন।
অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, বন্ড লাইসেন্স নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, ফাইল নিষ্পত্তি এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে একটি অসাধু চক্র সুবিধা নিয়ে আসছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের অভিযোগ, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড এবং এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির বন্ড সুবিধা ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
একই সূত্রের দাবি, রাফায়েত ফেব্রিক্সের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরদারি সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত রাজস্ব দায় এবং কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকটি সূত্র। তাঁদের দাবি, রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার বড়চাপা গ্রামে তাঁর বিপুল পরিমাণ জমি ও একটি বড় বাগানবাড়ি রয়েছে। সেখানে আধুনিক সুইমিং পুল নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন এবং সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর কিংবা অর্থ পাচারের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।ব
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কামরুল ইসলাম ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগ পান এবং ২০১২ সালের জুনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালন করেন। পরে যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অধীন বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পদায়ন ও দায়িত্ব পালনকে ঘিরেও কিছু অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান, মামলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছিল। তবে এসব দাবির পক্ষে নথিভিত্তিক প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য কিংবা কোনো তদন্তের চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়নি।
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা, তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে তিনি লিখিতভাবে জানান, গত এক মাসে কয়েকজন সাংবাদিক একই ধরনের প্রশ্ন করেছেন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন তারিখে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য না নিয়েই সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
কামরুল ইসলাম আরও বলেন, প্রতিবেদক ঠিক কী তথ্য পেয়েছেন এবং নির্দিষ্টভাবে কোন বিষয়টি জানতে চান, তা তাঁর জানা নেই। আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ভুল বোঝাবুঝি দূর হলে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হওয়া স্বাভাবিক।
বার্তা পাঠানোর সময় তিনি কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন বলে জানান। এক বন্ধুর অসুস্থ বাবাকে দেখতে যাচ্ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকায় থাকলে প্রতিবেদককে সরাসরি বিষয়গুলো দেখিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে পারতেন।
তবে সাংবাদিককে মারধর, হুমকি দেওয়া, মোবাইল ফোন থেকে তথ্য স্থানান্তর কিংবা জোর করে খাম পকেটে ঢুকিয়ে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর এই বক্তব্যে নির্দিষ্টভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক আমিনুল ইসলামের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর পদক্ষেপ কী, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়ে থাকলে তার তদন্তের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশপথের রেজিস্টার, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা নিরূপণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, রাজস্ব ফাঁকি, লাইসেন্সসংক্রান্ত অনিয়ম ও সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোও নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

