দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। দেশে কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়নি। যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব, শিক্ষক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা। ফলে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোয় (টিএসসি) শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্ধারিত আসনের অর্ধেকের বেশিই প্রতি বছর ফাঁকা থাকছে। এমনকি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাজীবন শেষে উপযুক্ত কর্মসংস্থানেরও অভাব রয়েছে। ফলে বেকারের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। যদিও বেকারত্ব নিরসনে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকার কারিগরি শিক্ষায় জোর দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এতে কেবল অর্থের অপচয় হচ্ছে, সফলতা মিলছে না। সরকারের উচিত কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে মনোনিবেশ করা। যথোপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, যাতে এর মান নিশ্চিত করা যায়। এতে সম্ভাবনা রয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছে এ শিক্ষা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে; শিক্ষার্থী সংকট দূর হবে।
বিগত সরকারের সময় শিক্ষার অবকাঠামো নির্মাণের ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় কারিগরি শিক্ষা খাতেও বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প নেয়া হয়, যার মধ্যে অন্যতম ৪২৯টি উপজেলায় ৪২৯টি টিএসসি নির্মাণের দুটি প্রকল্প। এর মধ্যে একটি প্রকল্পে ১০০টি এবং আরেকটি প্রকল্পের অধীন নির্মাণ হচ্ছে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর পর্যন্ত এগুলোর মধ্যে ৯১টি টিএসসিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য। প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক ও প্রচারণার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষাবর্ষেই আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থী পায়নি। কারিগরি বোর্ডের ২০২৩—২৪ শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল এমন ১৪৯টি টিএসসির প্রায় ৬২ শতাংশ আসনই ছিল ফাঁকা।
১৪৯টি প্রতিষ্ঠানে মোট আসন ছিল দেড় লাখের বেশি। নির্মাণাধীন ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান চালু হলে আসন বাড়বে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৯২০টি। শিক্ষার মান না বাড়িয়ে অবকাঠামো নির্মাণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু এরই মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় চলমান প্রকল্পগুলোর আওতায় অনেক কাজ সম্পন্ন হওয়ায় তা বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এমন বাস্তবতায় এটা সহজেই অনুধাবনযোগ্য যে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারলে এসব অবকাঠামো কোনো কাজেই আসবে না।
তাই সরকারকে এ শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। নয়তো আগামীতেও শিক্ষার্থী সংকট থেকেই যাবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন। বিদ্যমান পাঠ্যক্রম শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু দেশের কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম রয়ে গেছে এখনো সেকেলে।
গণসাক্ষরতা অভিযান প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন এডুকেশন ওয়াচ ২০২২—এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষক মনে করেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পাঠ্যক্রমের বেশির ভাগ কোর্স বর্তমান বাজারের চাহিদার তুলনায় সেকেলে। অর্থাৎ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে নিয়মিত আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা হয় না। যারা পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন আবশ্যক।
ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রায় ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষক উন্নত কারিগরি যন্ত্রাংশের অভাবকে কারিগরি পাঠদানের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন। এছাড়া ৪৮ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন এক্ষেত্রে আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষক সংকট। সুতরাং পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের পাশাপাশি উন্নত যন্ত্রাংশ এবং শিক্ষক সংকট দূর করতেও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি। এজন্য শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের বিকল্প নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদ্যমান সংকট তাই দূর করতে হবে। বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলো কেবল ডিগ্রি দিচ্ছে। শিল্পের চাহিদা উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না। ফলে শিক্ষাজীবনের নানা সংকটের প্রভাব পড়ছে কর্মজীবনে। ডিগ্রিধারীরা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে অনেকেই বেকার জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। এ অবস্থা উদ্বেগজনক।
এ থেকে উত্তরণে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ অপরিহার্য। পৃথিবীর উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যেমন চীন, জাপান, জার্মানি এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরির মানোন্নয়নে জোর দেয়ার সময় এসেছে। সে ধারাবাহিকতায় যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে অন্যতম আরেকটি সমস্যা হলো প্রচারের অভাব। এটিও আমলে নেয়া প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বেশির ভাগ মানুষই এ শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগ ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। তারা মনে করেন এটি কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য। অভিভাবকরা এখনো মেধাবী সন্তানকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পড়াতে চান না।
এছাড়া সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও চায় না তাদের শিক্ষার্থীরা কারিগরিতে আসুক। নানাভাবে তারা শিক্ষার্থীদের বাধাগ্রস্ত করে। এসব কারণেই কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন ফাঁকা থাকে। তাই প্রচারণা বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এ শিক্ষায় আসতে আগ্রহী হয়।

